রাত ৮টায় নদীর ধার দিয়ে ফিরছিল বাইক, আচমকা জঙ্গল চিরে সামনে হাজির কাল! বাঁকুড়ায় হাড়হিম করা কাণ্ড

রাত তখন আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার আর গা ছমছমে নীরবতা। বাঁকুড়ার জঙ্গল ঘেরা নদীর ধারের সেই নির্জন রাস্তা দিয়ে সচরাচর অতো রাতে কেউ যাতায়াত করে না। রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা পেয়ে দ্রুত গতিতে হু হু করে ছুটছিল একটি মোটরবাইক। কিন্তু আচমকাই ছন্দপতন! নদীর বুক চিরে অন্ধকারের মধ্যে থেকে হঠাৎই রাস্তায় উঠে এসে হাজির হলো সাক্ষাৎ কাল।
একেবারে বাইকের সামনাসামনি চলে আসে বিশালাকার এক জংলি হাতি। আচমকা এই দৃশ্য দেখে চরম ভয়ে বাইক চালক ততক্ষণে যানটির ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বাইকটি ডানে-বাঁয়ে করতে করতে সজোরে গিয়ে আছড়ে পড়ে রাস্তায়। কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ হয়নি। বাইকটি আছড়ে পড়ার পরই হিংস্র মেজাজে বাইকের পিছন পিছন ছুটতে শুরু করে বিশাল চেহারার হাতিটি।
দুর্ঘটনার সাথে সাথে বাইকে থাকা চালক ও আরোহীর মধ্যে চরম হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। রাস্তার ওপর বাইক উল্টে পড়তেই বাইকের পিছনে থাকা আরোহী কোনোরকমে উঠে প্রাণ বাঁচাতে ছুট লাগান। কিন্তু চালকের ওপর ভারি বাইকটি চেপে বসায়, তা সরিয়ে উঠে দাঁড়াতে সামান্য কিছুটা সময় লেগে যায়। আর সেই সামান্য কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানই কেড়ে নিল একটি মূল্যবান জীবন! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। বুনো হাতির নির্মম পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ওই প্রৌঢ়ের।
বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের বেলুট এলাকায় ঘটা এই শিউরে ওঠার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হাতির তাণ্ডবে মৃত প্রৌঢ়ের নাম বরেন তুং (৬৭)। তাঁর বাড়ি বেলিয়াতোড়ের বাঁকুড়ারডাঙা এলাকায়। ভয়াবহ এই ঘটনায় তাঁর বাইকের সঙ্গী অলৌকিকভাবে প্রাণে বাঁচলেও বরেনবাবুকে আর বাঁচানো যায়নি।
বন দফতর সূত্রে বিস্তারিত জানা গিয়েছে, গতকাল রাত আনুমানিক ৮টা নাগাদ বরেন তুং তাঁর এক পরিচিত সঙ্গীকে বাইকের পিছনে বসিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় বেলুট সংলগ্ন এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া শালি নদী থেকে হঠাৎই একটি বুনো হাতি ডাঙায় উঠে আসছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইক নিয়ে সোজা হাতির একেবারে মুখে পড়ে যান ওই দুই আরোহী। মুখোমুখি হতেই হাতিটি হিংস্র হয়ে বরেনবাবুর ওপর সরাসরি অতর্কিতে হামলা চালায়। বুনো জানোয়ারের সেই মারাত্মক আক্রমণে গুরুতর জখম হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। আর ঠিক সেই সুযোগেই তাঁর সঙ্গী নিজেকে সামলে নিয়ে কোনো মতে সেখান থেকে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন।
লোমহর্ষক এই দুর্ঘটনার খবর নিমেষের মধ্যে আশপাশের বেলুট-সহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পাওয়া মাত্রই আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন গ্রামবাসীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে অকুস্থলে তড়িঘড়ি পৌঁছায় স্থানীয় থানার পুলিশ বাহিনী। পুলিশ দ্রুত আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে বরেনবাবুকে নিকটবর্তী স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
বর্তমানে এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেলিয়াতোড় ও আশপাশের সমস্ত অঞ্চলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকায় বুনো হাতির অবাধ গতিবিধি নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের মনে প্রবল আতঙ্ক ও উদ্বেগ গ্রাস করেছে। ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত স্থানীয় অধিবাসীদের একাংশ অবিলম্বে বনাঞ্চলে ও লোকালয় সংলগ্ন রাস্তায় হাতির গতিবিধির ওপর বন দফতরের কড়া নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, হাতি চলাচলের প্রধান পথগুলিতে যদি আগাম সতর্কতা জারি করা হয় এবং বন কর্মীরা সঠিক সময় উপযুক্ত নজরদারি চালান, তবে ভবিষ্যতে এই ধরনের ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হবে।