ইজরায়েলে নেতানিয়াহু শাসনেরও অবসান? সরকার গঠনের ৩টি সম্ভাব্য পথ

ইজরায়েলে সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হলেও সরকার গঠন নিয়ে চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পার্লামেন্টে কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ভারতীয় রাজনীতির পরিভাষায় দেশটিতে এক ‘হাং পার্লামেন্ট’ বা ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন সব মহল থেকেই প্রশ্ন উঠছে—প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের জাদুকরী সংখ্যা ছুঁয়ে কে শেষ পর্যন্ত ইজরায়েলের মসনদে বসবেন?

ইজরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এর মোট ১২০টি আসনের মধ্যে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে, তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তথা প্রাক্তন সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। ইজরায়েলে সরকার গঠনের ন্যূনতম চাবিকাঠি হলো ৬১টি আসন। ফলে দুই প্রধান শিবিরের কেউই ক্ষমতার একক চাবিকাঠি অর্জন করতে পারেনি।

বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণ ও ‘কিংমেকার’ আরব দলসমূহ

এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক মানচিত্রে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে:

  • লিকুদের আসন সংকোচন: নেতানিয়াহুর দল লিকুদ (Likud) এখনও পর্যন্ত ইজরায়েলের একক বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে রয়েছে ২৭টি আসন নিয়ে। তবে ২০২২ সালের নির্বাচনে ৩২টি আসন জেতা লিকুদ এবার ৫টি আসন হারিয়েছে।

  • আরব দলগুলোর ঐতিহাসিক জয়জয়কার: এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক আরব দলগুলোর অভূতপূর্ব সাফল্য। ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ১১টি এবং ‘রা’আম’ ৮টি আসন পেয়ে মোট ১৯টি আসন নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে। ২০২২ সালে যেখানে তারা পেয়েছিল মাত্র ১০টি আসন, এবার সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে সরকার গঠনের মূল চালিকাশক্তি বা ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠেছেন তারা।

  • ভোটারের রেকর্ড উপস্থিতি: এবার ইজরায়েলে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছে। প্রায় ৭৮ শতাংশ নাগরিক নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা ২০২২ সালের (৭১ শতাংশ) তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে বেশি।

ভৌগোলিক মেরুকরণ: অঞ্চলভেদে ইজরায়েলের ভোটব্যাঙ্ক

১২২৪টি নির্বাচনী অঞ্চলের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির রাজনৈতিক পছন্দ সুস্পষ্টভাবে ভৌগোলিক ভিত্তিতে বিভক্ত:

  • নেতানিয়াহুর শক্ত ঘাঁটি: জেরুজালেম জেলায় নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৬৭.৫% ভোট। দক্ষিণাঞ্চলীয় ইজরায়েলেও তারা ৫১.২% ভোট পেয়ে আধিপত্য ধরে রেখেছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইজরায়েলি বসতিগুলোতে নেতানিয়াহু জোটের প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন দেখা গিয়েছে—প্রতি ৫ ভোটের ৪টিই গেছে তাঁদের পক্ষে।

  • বিরোধীদের জয়জয়কার: তেল আভিভ ও তার আশপাশের অঞ্চলে বিরোধী জোট ৫৬.২% ভোট পেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। মধ্য ইজরায়েল ও হাইফা জেলাতেও এগিয়ে আইজেনকোটের শিবির।

  • উত্তর ইজরায়েল: উত্তর ইজরায়েলে ৪৫.৬% ভোট পেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে আরব দলগুলো।

উল্লেখ্য, মোট ভোটের প্রায় ৫ শতাংশ এমন ছোট ছোট দলের অ্যাকাউন্টে গেছে, যারা নির্বাচনে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ৩.২৫% ন্যূনতম থ্রেশহোল্ড অতিক্রম করতে পারেনি। এই তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে ইয়োজ হেন্ডেলের নেতৃত্বাধীন রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি (২.৭২% ভোট)।

যুদ্ধ, সেনাবাহিনী ও ভূরাজনীতি: নেতানিয়াহু বনাম আইজেনকোট

নির্বাচনী লড়াইয়ে দুই নেতাই নিজেদের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন, তবে কিছু অভ্যন্তরীণ নীতিতে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে:

  • প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র ও গাজা নীতি: নেতানিয়াহু সরাসরি হুংকার দিয়ে বলেছেন, “আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে চলেছি—কোনো প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র থাকবে না। এই জমি আমাদের।” এই ইস্যুতে আইজেনকোটও সমমত পোষণ করে দ্বি-রাষ্ট্র নীতিকে ‘ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। গাজায় হামাসকে নিরস্ত্র করার প্রশ্নেও দুই নেতা একমত।

  • সেনাবাহিনীতে নিয়োগ সংঘাত: বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিয়ে। আইজেনকোটের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ইজরায়েলবাসীকে বেছে নিতে হবে—নেতানিয়াহুর ‘নিয়োগ এড়ানোর সরকার’, নাকি তাঁর ‘বাধ্যতামূলক নিয়োগের সরকার’।

  • সরকার বদলের ডাক: ভোটের রাতেই আইজেনকোট সুর চড়িয়ে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “লাখ লাখ ইজরায়েলি নাগরিক মিথ্যা, ব্যর্থতা, বিভাজন ও উস্কানির নোংরা রাজনীতিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।”

ইজরায়েলে সরকার গঠনের ৩টি সম্ভাব্য পথ

সম্ভাব্য পথ আসন সমীকরণ প্রধান বাধা বা শর্ত
১. ইহুদি-আরব জোট আইজেনকোটের জোট + ২ আরব দল = ৬৭ আসন আরব দলগুলোকে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন মেনে নেওয়া ও তাদের অস্ত্র বাজেয়াপ্ত সমর্থনের শর্ত দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে বাইরে থেকে ৬ জন আরব সাংসদের সমর্থন নিয়েও সরকার গঠিত হতে পারে।
২. জাতীয় ঐক্য সরকার লিকুদ + ইয়াশার + টুগেদার + ইজরায়েল বেইতেনু = ৬৭ আসন রাজনৈতিক বৈরিতা। গোটা প্রচারপর্বেই আইজেনকোটের প্রধান অঙ্গীকার ছিল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
৩. সাংসদ ভাঙানো / দলবদল নেতানিয়াহুর জোট (৫৩) + বিরোধী/অন্যান্য (৮) = ৬১+ আসন ইজরায়েলের রাজনীতিতে দলবদল নতুন নয়। প্রয়োজনীয় ৮টি আসনের জন্য বিরোধী শিবিরের সাংসদ ভাঙাতে মরিয়া নেতানিয়াহু।

সিদ্ধান্ত এখন প্রেসিডেন্ট হারজগের হাতে

ইজরায়েলের জটিল রাজনৈতিক নাটকের পরবর্তী পর্ব নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের ওপর। তিনি শীঘ্রই প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠকে বসবেন। আলোচনার ভিত্তিতে সরকার গঠনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকা নেতার হাতে ২৮ দিনের সময়সীমা দেওয়া হবে (প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে)।

যদি এই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেও কোনো পক্ষ ৬১টি আসন জোড়া দিতে না পারে, তবে আবারও নির্বাচনী অনিশ্চয়তায় পড়বে ইজরায়েল। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যেভাবে ৫ বার নির্বাচন দেখতে হয়েছিল দেশকে, সেই স্মৃতিই কি ফিরতে চলেছে? নেতানিয়াহুর লিকুদ বৃহত্তম দল হলেও ইজরায়েলের কুর্সি শেষ পর্যন্ত কার দখলে যায়, সেদিকেই নজর রাখছে সমগ্র বিশ্ব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *