১৭ বছরেও পাননি বাবার সম্পদ,মাইকেল জ্যাকসনের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব!

মাইকেল জ্যাকসনের প্রয়াণের দীর্ঘ সতেরো বছর অতিক্রান্ত হলেও পপসম্রাটের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি এবং তার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও বিরোধ আজও থামার কোনো নাম নিচ্ছে না। প্রয়াত কিংবদন্তি শিল্পীর বহুমূল্য সম্পত্তি থেকে নিজেদের পারিবারিক ট্রাস্টের জন্য আক্ষরিক অর্থেই বিশাল অঙ্কের অর্থ দাবি করে সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন মাইকেলের সুযোগ্য কন্যা প্যারিস জ্যাকসন। তার মূল অভিযোগ, বাবার মৃত্যুর পরবর্তী সময় থেকে জ্যাকসনের এস্টেট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক চুক্তি ও স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করলেও সন্তানদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য গঠিত পারিবারিক ট্রাস্টে এখনও পর্যন্ত আইনানুগ কোনো অর্থ জমা করা হয়নি।
গত ২৯ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি স্থানীয় আদালতে দায়ের করা সেই আইনি আবেদনে প্যারিস জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ২০০৯ সালে পপসম্রাটের আকস্মিক মৃত্যুর পর থেকে তার এস্টেট একাধিক লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তির মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঘরে তুলেছে। অথচ তাঁর এবং দুই ভাইয়ের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষার্থে যে পারিবারিক ট্রাস্টটি গঠিত হয়েছিল, সেটি আজও প্রায় শূন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই গুরুতর প্রেক্ষাপটেই এস্টেট কর্তৃপক্ষের কাছে অন্তত ৬০০ মিলিয়ন ডলার অবিলম্বে ট্রাস্টে হস্তান্তরের জন্য কঠোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, মাইকেল জ্যাকসনের তিন সন্তান হলেন প্রিন্স, প্যারিস এবং বিগি। সন্তানদের আর্থিক ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই এই বিশেষ পারিবারিক ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছিল। ট্রাস্টের নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানের বয়স একুশ বছর পূর্ণ হলেই নিজ নিজ অংশের লভ্যাংশ পাওয়ার কথা। এছাড়া ত্রিশ, পঁয়ত্রিশ ও চল্লিশ বছর বয়সসীমায় মূল সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশ হস্তান্তরের পরিষ্কার বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্যারিসের স্পষ্ট দাবি, বাবার রেখে যাওয়া সেই অঢেল সম্পত্তির বন্টনের ক্ষেত্রে এই শর্তগুলি কখনোই যথাযথ ও স্বচ্ছভাবে কার্যকর করা হয়নি। বর্তমানে বড় ছেলে প্রিন্সের বয়স প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, প্যারিসের বয়স ঊনত্রিশ এবং কনিষ্ঠ পুত্র বিগির বয়স পঁচিশের কোঠায়। এতগুলো বছর কেটে যাওয়ার পরেও তাদের প্রত্যাশিত অর্থ ট্রাস্টের তহবিলে জমা না হওয়ায় তাদের বাধ্য হয়ে এস্টেটের প্রধান নির্বাহক জন ব্রাঙ্কার ওপর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে।
প্যারিসের আইনজীবীদের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছরে মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেট বেশ কয়েকটি রেকর্ড ভাঙা ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পন্ন করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিকগুলি হলো—২০১৮ সালে ২৮৭.৫ মিলিয়ন ডলারে ইএমআই মিউজিকের শেয়ার বিক্রি, ২০২০ সালে ২২ মিলিয়ন ডলারে বিখ্যাত নেভারল্যান্ড র্যাঞ্চ বিক্রি এবং সবশেষ ২০২৩ সালে সনি কর্পোরেশনের সঙ্গে মাইকেলের অরিজিনাল গানের স্বত্ব বিক্রির বিশাল চুক্তি। এই সমস্ত বাণিজ্যিক লেনদেন থেকে যাবতীয় কর এবং আনুষঙ্গিক খরচ বাদেও এস্টেটের নিট আয় এক বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অনায়াসে পার করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এস্টেটের কোষাগারে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ সংরক্ষিত ছিল। সমস্ত সম্ভাব্য দায়দেনা ও প্রশাসনিক খরচ মিটিয়ে ফেলার পরেও সেখান থেকে অন্তত ৬০০ মিলিয়ন ডলার পারিবারিক ট্রাস্টের তহবিলে অনায়াসে স্থানান্তর করা সম্ভব। সবমিলিয়ে পপসম্রাটের এস্টেটের বর্তমান সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রায় ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে বলে দাবি তুলেছেন প্যারিসের আইনি প্রতিনিধিরা।
অন্যদিকে, প্যারিসের তোলা এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগের সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করেছে মাইকেল জ্যাকসন এস্টেট কর্তৃপক্ষ। তাদের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের চলমান আইনি বিরোধ এবং বেশ কিছু অমীমাংসিত আর্থিক জটিলতা সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পারিবারিক ট্রাস্টে এককালীন সম্পূর্ণ অর্থ স্থানান্তর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এস্টেটের পক্ষ থেকে জারি করা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, উত্তরাধিকারের অর্থ আটকে রাখা কিংবা সন্তানদের মাসিক ও বার্ষিক বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য। বরং পপসম্রাটের সন্তানদের সর্বোচ্চ কল্যাণের স্বার্থে ইতিমধ্যে দুইশো মিলিয়নেরও বেশি ডলার বিভিন্ন খাতে প্রদান করা হয়েছে।
এস্টেটের তরফ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে যে, মাইকেল জ্যাকসনের মূল উইল বা ইচ্ছাপত্র অনুযায়ী, তার সন্তানদের বয়স ত্রিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বড় অঙ্কের কোনো নগদ অর্থ এককালীন হাতে পাওয়ার কথা নয়। ফলে উত্তরাধিকার সম্পত্তি বন্টন এবং ট্রাস্টের অর্থ স্থানান্তর সংক্রান্ত বিষয়ে প্যারিসের দাবি এবং এস্টেটের কাঠামোগত অবস্থানের মধ্যে এক বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে। এই জটিল আইনি দ্বন্দ্বের জেরে আগামী ৪ ডিসেম্বর লস অ্যাঞ্জেলেস আদালতে প্যারিস জ্যাকসনের করা এই আবেদনের ওপর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, পপসম্রাটের বিপুল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার ও পারিবারিক ট্রাস্টের অর্থ জট কাটাতে আদালত শেষ পর্যন্ত কী রায় প্রদান করে।