গৌতম আদানি হাত বাড়াতেই রকেটের গতিতে ছুটল এই সরকারি শেয়ার! শেয়ার বাজারে হঠাৎ কী ঘটে গেল?

শেয়ার বাজারে যখন কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা বড় কোনো কাজের অর্ডার পায়, তখন তার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে কোম্পানির শেয়ারের ওপর। বুধবার, ৪ নভেম্বর ঠিক এই ধরনেরই এক তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল সরকারি মহারত্ন সংস্থা ‘ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড’ বা ভেল (BHEL)-এর শেয়ারের সঙ্গে।

বুধবার সকালে বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে BHEL-এর শেয়ার কেনার হিড়িক পড়ে যায়। দেখতে দেখতে শেয়ারের দাম রকেটের মতো ওপরের দিকে ছুটতে শুরু করে। লেনদেনের এক পর্যায়ে এই সরকারি সংস্থার শেয়ার প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে ওঠে।

যদিও শুরুর দিকের সেই উন্মাদনার পর শেয়ারের গতি কিছুটা থমকেছিল, তবুও বেলা ১১:৪৫ নাগাদ BHEL-এর শেয়ার ৫.৫৩ শতাংশ বৃদ্ধির সাথে ৪২২.২০ টাকার স্তরে লেনদেন করছিল। বাজারে হঠাৎ এই ঝড়ের নেপথ্যে রয়েছে শিল্পপতি গৌতম আদানির সংস্থা ‘আদানি পাওয়ার’ (Adani Power)-এর সঙ্গে হওয়া একটি বিশাল অঙ্কের মেগা চুক্তি! বুধবারই ভেল-এর তরফে স্টক এক্সচেঞ্জকে এই নতুন মেগা চুক্তির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। জানা গিয়েছে, আদানি পাওয়ারের থেকে প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা থেকে ২৮,০০০ কোটি টাকা মূল্যের সুবিশাল অর্ডার পেয়েছে সংস্থাটি।

চার মেগা প্রজেক্টে কী কাজ করবে BHEL?
আদানি পাওয়ারের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিতে BHEL-কে চারটি পৃথক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য কাজ নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে প্রতিটি প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২×৮০০ মেগাওয়াট।

এই চুক্তির অধীনে এই সরকারি সংস্থাকে বয়লার, টারবাইন, জেনারেটরসহ নানা আনুষঙ্গিক ভারী যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের সরবরাহ করতে হবে। শুধু যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মেটেরিয়াল দিয়ে হাত গুটিয়ে নেওয়া তা নয়, একই সঙ্গে এই প্রকল্পগুলি সফলভাবে চালু করতে প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রযুক্তিগত ও পরিচালন সংক্রান্ত পরিষেবাও নিশ্চিত করবে ভেল। এত বড় আর্থিক পরিমাণের চুক্তি হাতে আসায় স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা এই সরকারি কোম্পানির ওপর বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।

আড়াই লাখ কোটির গণ্ডি পেরিয়ে অর্ডার বুক!
নতুন নতুন অর্ডারের ক্ষেত্রে BHEL-এর বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আশাব্যঞ্জক। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির হাতে থাকা মোট অর্ডার বুকের পরিমাণ ২,৫৭,৫৭১ কোটি টাকার রেকর্ড গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম অর্ধেকের (First Half) দিকে নজর রাখলে দেখা যাবে, ভেল ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার নতুন চুক্তি ও কাজের অর্ডার হাসিল করে নিয়েছে। যদিও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নতুন অর্ডার পাওয়ার গতিতে কিছুটা ওঠানামা লক্ষ করা গিয়েছে।

চলতি অর্থবর্ষের প্রথম অর্থাৎ জুন ত্রৈমাসিকে (Q1FY27) কোম্পানি ২৬,৭০ কেজি টাকার বিপুল অর্ডার পেয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় অর্থাৎ সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে (Q2FY27) সেই পরিসংখ্যান কিছুটা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকায়। তবে বিগত অর্থবর্ষের (FY26) পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, প্রথম ত্রৈমাসিকে (Q1FY26) ১০,৫০০ কোটি টাকা, দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (Q2FY26) ২১,৯০০ কোটি টাকা এবং শেষ ত্রৈমাসিকে (Q4FY26) ৩০,০০০ কোটি টাকার মেগা অর্ডার হাতে পেয়েছিল এই সরকারি সংস্থা।

সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে দুর্দান্ত আয় ও মুনাফার লাফ
সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে নতুন কাজ পাওয়ার গতি কিছুটা ধীর থাকলেও, আয়ের দিক থেকে বাজিমাত করেছে BHEL। চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে সংস্থার কাজের মাধ্যমে অর্জিত রেভিনিউ এবং অপারেটিং প্রফিট—উভয় ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে চোখধাঁধানো বৃদ্ধি।

বাৎসরিক ভিত্তিতে কোম্পানির রেভিনিউ ২৩.৮১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯,৩০০ কোটি টাকায়। যেখানে ঠিক এক বছর আগের একই সময়সীমায় কোম্পানির অর্জিত রেভিনিউ ছিল ৭,৫১১.৮ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, কাজের মুনাফা অর্থাৎ EBITDA-র ক্ষেত্রে তো এক অলৌকিক সাফল্য দেখিয়ে ফেলেছে BHEL। সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে ভেল-এর EBITDA ৭৬.৪ শতাংশের এক বিশাল লাফ মেরে ১,০২৫.৮ কোটি টাকার গণ্ডি ছুঁয়েছে! উল্লেখ্য, ঠিক এক বছর আগে একই সময়সীমার এই পরিসংখ্যান ছিল মাত্র ৫৮১.৪৬ কোটি টাকা। ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফলের এই নজরকাড়া রিপোর্ট প্রকাশ পেতেই শেয়ার বাজারে সংস্থার গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের দুর্দান্ত রিটার্ন, ব্রোকারেজ ফার্মের বাড়তি আশা
BHEL-এর শেয়ার বিগত দিনগুলিতে বিনিয়োগকারীদের একেবারেই নিরাশ করেনি। গত এক বছরের পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই সরকারি শেয়ারটি প্রায় ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, শুধুমাত্র চলতি ২০২৬ বছরের হিসাব ধরলে এতে ৪৫ শতাংশের বেশি রিটার্ন পাওয়া গিয়েছে।

কোম্পানির সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকের এই অভাবনীয় সাফল্যের পর বহুজাতিক ব্রোকারেজ ফার্ম ‘IIFL ইনস্টিটিউশনাল ইকুইটিজ’ (IIFL Institutional Equities)-ও ভেল-এর ওপর চরম আস্থা প্রকাশ করেছে। ব্রোকারেজ ফার্মটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রেণু বৈদ পুগলিয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, BHEL-এর প্রকৃত পারফরম্যান্স বাজার বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি ভালো ছিল।

সংস্থার এই অভাবনীয় ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সকে ভিত্তি করে ব্রোকারেজ ফার্মটি আগামী দুই বছরের জন্য BHEL-এর আয়ের (Earnings) পূর্বাভাস একধাক্কায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এবার আদানি পাওয়ারের থেকে আসা এই নতুন ২৮,০০০ কোটি টাকার চুক্তি ভেল-এর শেয়ারকে আগামী দিনে যে আরও বড় উচ্চতায় নিয়ে যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত বাজারের অভিজ্ঞ মহল!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *