“মিশেলও দিনে পাঁচবার বলে আমি বোকা!” ওবামার কোন রসিকতায় কেঁপে উঠল প্রচারসভা?

আমেরিকার রাজনৈতিক ময়দান থেকে বিদায় নিয়েছেন এক দশকেরও বেশি সময় হয়ে গেছে। দীর্ঘ দিন ধরে সক্রিয় রাজনীতিতেও সেভাবে তাঁর দেখা মেলে না। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মিডটার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জোরালোভাবে জয়ী করতে আচমকাই একেবারে চেনা ছন্দে ময়দানে নেমে পড়েছিলেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা (Barack Obama)। আর ওবামার সেই নিখুঁত ও মাস্টারস্ট্রোক প্রচারের সুফলই যে ডেমোক্র্যাট শিবির হাতেনাতে পেয়েছে, তা একবাক্যে স্বীকার করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।

ওহায়ো থেকে মিশিগান: প্রচারে ওবামার ক্যারিশমা
মিডটার্ম নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে ওহায়ো, মিশিগান এবং জর্জিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে চষে বেড়িয়েছেন ওবামা। শুধু জনসভাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, নির্বাচনের জন্য দলীয় তহবিল সংগ্রহ ও আর্থিক সাহায্য জোগাড়েও অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। এমনকি মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের তরুণ প্রার্থী আব্দুল আল সায়াদের হয়েও প্রচারে যান ওবামা, যিনি অতীতে খোদ ওবামা প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচক বলেই পরিচিত ছিলেন।

আব্দুলের সঙ্গে নিজের অতীত রাজনৈতিক মতবিরোধের কথা লুকোননি ওবামা নিজেও। ডেট্রয়েটের এক বিশাল প্রচারসভায় খোলামেলা সুরে তিনি বলেন, “আমি যখন প্রেসিডেন্ট ছিলাম, আমার সরকার যেসব নীতি নিতে চেয়েছিল, তার কিছু কিছু বিষয়ে আব্দুল আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু কার সব পদক্ষেপের সঙ্গে সবাই একমত হন? এই যেমন আমার স্ত্রী মিশেল! সেও একই গোত্রে পড়ে। দিনে অন্তত পাঁচবার আমাকে ডেকে বলে—‘কী বোকা তুমি? এটা কেন করলে?’।” ওবামার এই স্বতঃস্ফূর্ত ও রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য শোনার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো সভাকক্ষ হাসির রোল ও করতালিতে ফেটে পড়ে।

আদি ও নব্য ডেমোক্র্যাটদের সেতুবন্ধন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওবামার এই সহজ স্বীকারোক্তি নিছক রসিকতা ছিল না; বরং নিজের স্ত্রীর উদাহরণ টেনে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আদি এবং নব্য প্রজন্মের ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এক নিবিড় সেতুবন্ধন গড়ে দিয়েছিলেন। দলের প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে যাঁরা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিচিত হতে চাইছিলেন, ওবামার জাদুকরী ব্যক্তিত্ব তাঁদেরও আবেগের সুতোয় একসঙ্গে বেঁধে ফেলেছিল।

ট্রাম্পকে নিশানা ও ‘চিজ়কেক ফ্যাক্টরি’ মন্তব্য
প্রচারমঞ্চে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অত্যন্ত ধারালো আক্রমণ করতে দেখা যায় ওবামাকে। ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “এই নির্বাচনই আমাদের দেশের জন্য শেষ সুযোগ, যার মাধ্যমে ওঁর মূর্খামিকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখার উপযুক্ত পদক্ষেপ করা সম্ভব।” ওহায়োর একটি সভায় তো তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেন, “এখন হোয়াইট হাউসের দিকে তাকালে মনে হয় সাদ্দাম হুসেন যেন চিজ়কেক ফ্যাক্টরি খুলে বসে রয়েছেন!”

ডেমোক্র্যাট হাইকমান্ড অত্যন্ত সুকৌশলে প্রচারের একদম শেষ পর্যায়ে ওবামাকে মাঠে নামায়। এর ফলে তরুণ প্রার্থীরা নিজেদের স্বতন্ত্র মুখ হিসেবে তুলে ধরার পর্যাপ্ত সুযোগ পান, আর ঠিক শেষ মুহূর্তে নিজের তারকাসুলভ জনপ্রিয়তার আলো নিয়ে হাজির হন ওবামা। এর বিপরীতে ট্রাম্পের জনসভাগুলিতে জনরোষ ও অসন্তোষ যেভাবে প্রকাশ্যে আসছিল, তা ডেমোক্র্যাটদের কাজ অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল।

ওবামার আমলে হোয়াইট হাউসের বিবৃতি লেখক ডেভিড লিটের মূল্যায়ন
ওবামার এই রাজনৈতিক কামব্যাক ও প্রচার কৌশল সম্পর্কে বলতে গিয়ে হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন বিবৃতি লেখক ডেভিড লিট বলেন, “ওবামা নতুন প্রজন্মের নেতাদের সমর্থন জোগাতে সামনে এসেছেন, নিজে সবকিছু কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেননি। মার্কিন সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আজও আকাশছোঁয়া। তরুণ এবং কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একাই ভোটকেন্দ্রে টেনে আনার অসামান্য ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। আমেরিকার সমসাময়িক রাজনীতিতে আর কোনো প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের এই কৃতিত্ব নেই।” লিটের মতে, ওবামার সাধারণ মন্তব্যও প্রতিপক্ষ ট্রাম্পকে বিচলিত করে তোলে, অথচ তিনি কখনোই নিজের সংযম হারাননি।

ফলাফল ও ওবামার আবেগঘন বার্তা
মিডটার্ম নির্বাচনের ভোটগণনা ও মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ একটু একটু করে সুদৃঢ় হওয়ার মুখে দেশবাসীর উদ্দেশে একটি আবেগঘন বিবৃতি দেন বারাক ওবামা। তিনি লেখেন—“মানুষ আজ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে তাঁরা সমাজে বিভাজন সৃষ্টিকারী নেতা চান না। তাঁরা এমন নেতৃত্ব চান, যা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং প্রকৃত সমস্যার সমাধান করতে পারে… বর্তমান সরকারের মেয়াদ ফুরোতে এখনও দু’বছর বাকি। এখনই আমাদের কঠোর পরিশ্রম শুরু করতে হবে। ভবিষ্যতে নতুন ভিত গড়ার কাজ আজ থেকেই শুরু করতে হবে।”

সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক থেকে শুরু করে ডেমোক্র্যাট শিবিরের তাবড় নেতারা একবাক্যেই স্বীকার করছেন যে, এবারের মিডটার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রধান ‘X ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠেছিলেন একমাত্র বারাক ওবামাই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *