দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলেও লড়া যাবে পঞ্চায়েত-পুরসভা নির্বাচন? সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক পদক্ষেপে তোলপাড় দেশ!

ভারতের একাধিক রাজ্যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে দুইয়ের বেশি সন্তান থাকা ব্যক্তিদের পঞ্চায়েত ও পুরসভার মতো স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য ঘোষণা করার নিয়ম চালু রয়েছে। তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের আইনগুলি তাদের মূল উদ্দেশ্য এবং প্রাসঙ্গিকতা—দুটোই হারিয়েছে বলে স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ভারতে দ্রুত হ্রাস পাওয়া প্রজনন হার বা ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’ (TFR)-এর কথা মাথায় রেখে শীর্ষ আদালত ২০০৩ সালের ঐতিহাসিক ‘জাবেদ বনাম হরিয়ানা রাজ্য’ মামলার রায় পুনঃমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বিষয়টি বড় বেঞ্চে বা ‘লার্জার বেঞ্চে’ স্থানান্তরিত করেছে।
২০০৩ সালের রায়ের পুনঃমূল্যায়ন ও বর্তমান জনসংখ্যা চিত্র
২০০৩ সালে ‘জাবেদ বনাম হরিয়ানা রাজ্য’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ ‘হরিয়ানা পঞ্চায়েতি রাজ আইন, ১৯৯৪’-এর দুই-সন্তান নীতির সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রেখেছিল। তবে সাম্প্রতিক এক মামলায় বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাধের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমান ডেমোগ্রাফিক পরিস্থিতিতে ওই রায়ের পর্যালোচনার অত্যন্ত প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
আদালত উল্লেখ করে, ২০০৩ সালে যখন এই নীতিকে সমর্থন করা হয়েছিল, তখন ভারতে গড় প্রজনন হার ছিল ৩। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯-এ, যা জনসংখ্যা স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন স্তর বা ‘রিপ্লেসমেন্ট রেট’ (২.১)-এরও অনেক নিচে। সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা হু-হু করে বাড়বে এবং কর্মক্ষম যুবশক্তির অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে।
প্রজনন স্বাধিকার ও মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি পি এস নরসিংহ কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দুইয়ের বেশি সন্তান থাকার অপরাধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনটি আজ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। কয়েক দশক ধরে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের যে ভয় ছিল, তা এখন আর নেই।”
তিনি আরও যোগ করেন, এই ধরনের কঠোর আইন বহু নাগরিককে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, যার সঙ্গে একজন জনপ্রতিনিধি হওয়ার মূল যোগ্যতার কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই। উল্টে এটি নাগরিককে সন্তান ধারণ করা অথবা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করে—যা সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা মৌলিক প্রজনন স্বাধিকারকে (Reproductive Rights) সরাসরি লঙ্ঘন করে।
বহাল হলো সাবেক সরপঞ্চের পথ, খারিজ অযোগ্যতার রায়
এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট মহারাষ্ট্রের কাকোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সাবেক সরপঞ্চ মঙ্গলা ভীমরাওয়ের অযোগ্যতার নির্দেশ খারিজ করে দিয়েছে। ২০০০ সালের সংশোধিত ‘মহারাষ্ট্র ভিলেজ পঞ্চায়েত আইন’-এর অধীনে তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেওয়ায় মঙ্গলাকে তাঁর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং বম্বে হাইকোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছিল। হাইকোর্টের ওই রায় বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট মঙ্গলার পদ পুনর্বহাল করেছে।
বিভিন্ন রাজ্যে আইনের বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ
আদালতে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, এই আইনের প্রয়োগে দেশজুড়ে ব্যাপক বৈষম্য দেখা গেছে:
১৫টি রাজ্যে এই সংক্রান্ত কোনো নিষেধাজ্ঞা বা আইনই নেই।
৭টি রাজ্য পূর্বে চালু করলেও পরবর্তীতে এই দুই-সন্তান নীতি বাতিল ঘোষণা করেছে।
৬টি রাজ্যে এখনও এই নিয়ম বহাল রয়েছে—অসম, গোয়া, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং উত্তরাখণ্ড।
সুপ্রিম কোর্টের এই কঠোর অবস্থানের পর অসম, মহারাষ্ট্র বা গুজরাটের মতো রাজ্যগুলিতে বহাল থাকা দুই-সন্তান নীতির ভবিষ্যৎ এখন বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে। সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে ভারতে স্থানীয় নির্বাচন ও নাগরিকদের প্রজনন অধিকারের আগামী আইনি রূপরেখা।