ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে আইফোন দিয়েই ছবি তৈরি! হার্ড ড্রাইভ ক্র্যাশ হওয়ার পরও যে মহাকাব্য বানালেন বাংলার তরুণেরা

বড় বাজেট, দামি সিনে ক্যামেরা কিংবা অত্যাধুনিক আলোর সরঞ্জাম ছাড়াই কি আস্ত একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছবি তৈরি করা সম্ভব? প্রচলিত এই ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক অভিনব ও তাক লাগানো উদ্যোগ নিলেন দুই তরুণ নির্মাতা চিশতী টি এম ও তনুময় বিশ্বাস। তাঁদের যৌথ পরিচালনায় তৈরি বাংলা ছবি ‘মোহনা-টাইডস অফ ডেস্টিনি’ এই মুহূর্তে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এক নতুন ও আশাব্যঞ্জক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই ছবির সম্পূর্ণ শুটিং করা হয়েছে একটি সাধারণ আইফোন ১২ (iPhone 12) ব্যবহার করে, যার সঙ্গে ছিল কেবল একটি ছোট এলইডি আলো এবং কিছু সাধারণ টাংস্টেন বাল্ব!

ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে সিনেমার খেয়ালি দুনিয়ায়:
ছবির পেছনের গল্পটাও কম রোমাঞ্চকর নয়। পরিচালক চিশতী টি এম-এর শৈশব বা বহুদিনের স্বপ্ন ছিল চলচ্চিত্র নির্মাণ। সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে তিনি নিজের নিশ্চিত ও লোভনীয় ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা চিরতরে ছেড়ে দেন। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে বারবার চেষ্টা করেও সহজে সুযোগ না মেলায় দমে যাননি তিনি; বরং নিজের প্রতিভা ও ইচ্ছাশক্তির ওপর ভরসা করে নিজেই ছবি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। আর সেই সুদৃঢ় ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘মোহনা’।

তবে এই ছবির নির্মাণযাত্রা একেবারেই মসৃণ ছিল না। আর্থিক প্রতিকূলতা তো ছিলই, তার ওপর এক ভয়াবহ প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের মুখেও পড়তে হয় নির্মাতাদের। আচমকাই হার্ড ড্রাইভ বিকল হয়ে যাওয়ায় ছবির সম্পূর্ণ এডিটিং এবং সাউন্ড ডিজাইনিংয়ের কাজ নষ্ট হয়ে যায়! কিন্তু এত বড় ধাক্কাও তাঁদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে নতুন করে সম্পাদনা ও শব্দের কাজ শেষ করে ছবিটিকে আলোর মুখ দেখিয়েছেন তাঁরা।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা ও এক পুরনো প্রদীপ:
‘মোহনা’ ছবির মূল গল্প আবর্তিত হয়েছে সাবিনা ও সুলেমান নামের এক দম্পতিকে কেন্দ্র করে, যাঁরা কলকাতায় একটি সাধারণ ও সুন্দর জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু হঠাৎ করেই একটি প্রাচীন পিতলের প্রদীপ তাঁদের জীবনের চাকা সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়।

ওই প্রদীপকে কেন্দ্র করে একটি আপাতনিষ্পাপ ইচ্ছা অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁদের ঠেলে দেয় প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ট্র্যাজেডির এক জটিল ও রহস্যময় আবর্তে। বাস্তব জীবনের রূঢ় আবেগের সঙ্গে ম্যাজিক রিয়ালিজম বা অলৌকিক ঘটনার মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এই ছবির চিত্রনাট্য, যেখানে মানুষের গভীর আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পর্কের টানাপড়েন অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে।

পরিচালকের আত্মবিশ্বাসী বার্তা:
ছবিটির নির্মাণ প্রসঙ্গে পরিচালক চিশতী টি এম বলেন, “সিনেমার পরিচয় তার ক্যামেরা কিংবা বাজেট দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং আসল শক্তি হলো গল্প বলার অদম্য সাহস।” একটি আইফোন ১২, সামান্য কিছু সাধারণ বাল্ব এবং স্বপ্নে বিশ্বাসী একদল মানুষকে নিয়ে শুরু হওয়া এই লড়াই প্রমাণ করে যে, সীমাবদ্ধতা কখনোই দৃঢ় সংকল্পকে পরাজিত করতে পারে না।

তারকা ও কলাকুশলীরা:
‘মোহনা-টাইডস অফ ডেস্টিনি’ ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন অপূর্ব বর, মৃয়াঙ্কা ব্যানার্জি এবং বৃষ্টি রায়। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় দেখা যাবে কৌশিক গোস্বামী, চিশতী টি এম, অর্পিতা দাস, শাশ্বতী গোস্বামী, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী সহ এক একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পীকে।

ছবিটির সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন সায়ন সরকার ও সুনিতা আইচ। সংগীত পরিচালনা ও গীত রচনা করেছেন অভ্রদীপ্ত ব্যানার্জি এবং আবহসংগীতে রয়েছেন রাজদীপ দাশগুপ্ত। ‘চিশতী ক্রিয়েশনস’-এর ব্যানারে এবং ‘প্যারালাল ফিল্মস’-এর সহযোগিতায় নির্মিত এই ছবি প্রযোজনা করেছেন খোদ চিশতী টি এম।

দামি প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না রেখেও যে কেবল সৃজনশীলতা, নিখাদ আবেগ এবং সঠিক ভাবনার জোরে পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত ছবি তৈরি করা সম্ভব, ‘মোহনা’ ছবির মাধ্যমে সেই বার্তাই জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন নির্মাতারা। স্বাধীন সিনেমার দুনিয়ায় এই উদ্যোগ বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটে এক নতুন পালক যোগ করল বললেই চলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *