নীল থেকে সোজা গেরুয়া! সরকার বদলাতেই কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের লোগোতে বিরাট বদল, ডিজাইন করলেন কে?

শীতকাল মানেই তিলোত্তমায় নন্দন চত্বরে দেশ-বিদেশের ছবি দেখার ভিড় আর সিনেপ্রেমীদের বাঁধভাঙা উল্লাস। ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF) দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলার রাজনৈতিক পালাবদল, প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের এক অন্যতম জীবন্ত সাক্ষী। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসবের রঙ ও রূপ বহুবার বদলেছে, আর তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল এর লোগো পরিবর্তনের ইতিহাস। দীর্ঘ ১১ বছর পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতেই ফের নতুন রূপ পেল কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের লোগো।

বাম আমল থেকে তৃণমূল জমানা: লোগোর বিবর্তন

১৯৯৫ সালে তৎকালীন বাম সরকারের আমলে ‘ক্যালকাটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ (CFF) নামে এই উৎসবের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানের ভালো সিনেমা সাধারণের নাগালে পৌঁছে দেওয়া এবং বাংলা সিনে ইন্ডাস্ট্রিকে সমৃদ্ধ করা। প্রথম সেই লোগোটি ডিজাইন করেছিলেন কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের পুত্র সন্দীপ রায়। সেটি ছিল একটি ফিল্ম স্ট্রিপ বা স্প্রোকেট আকৃতির অক্ষরের মেলবন্ধন, যা ছিল বাম আমলের বুদ্ধিজীবী সমাজের রুচির পরিচায়ক। পরবর্তী সময়ে শহরের নাম বদলে ক্যালকাটা থেকে কলকাতা হওয়ায় উৎসবের নামও হয় KIFF।

এরপর ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদল ঘটে এবং তৃণমূলে সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালে উৎসবের লোগোতে প্রথম বড়সড় পরিবর্তন আনা হয়। সর্বসাধারণের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তৈরি সেই লোগোতে ‘K’ অক্ষরের ওপর সিনেমার ক্যামেরা এবং ‘F’ অক্ষরের ওপর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরী স্থান পায়। লোগোর ব্যাকগ্রাউন্ডে রাখা হয় সাদা, কালো এবং তৎকালীন শাসকদলের প্রতীকী নীল রঙের ছোঁয়া। গত ১১ বছর ধরে এই নীল-সাদা লোগোটিই উৎসবের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিল।

ফিরে এলেন সন্দীপ রায়, গেরুয়া রঙে মোড়া নতুন লোগো

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৬ সালের চলচ্চিত্র উৎসবের লোগোতে এল আরও এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নতুন লোগোর ডিজাইনার হিসেবে আবারও ফিরিয়ে আনা হলো বাম আমলের সেই পুরনো স্রষ্টা—সন্দীপ রায়কেই।

নতুন এই লোগোর নকশায় বেশ কিছু আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে ক্যামেরা এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরিকে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে ভিক্টোরিয়ার প্রতীক সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে অনেকে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে আসার দেশীয় প্রয়াস হিসেবে দেখছেন। নতুন কালো ও গেরুয়া রঙের এই লোগোতে যুক্ত হয়েছে শরৎকালের কাশফুলের মোটিফ এবং সিনেমার রিলের স্প্রকেট।

দীর্ঘ দেড় দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ‘নীল-সাদা’ রঙটি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে থাকলেও, বর্তমান সরকারের আমলে লোগোতে গেরুয়া রঙের এই প্রবেশ স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জোর চর্চা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে নতুন এই লোগো ও উৎসবের উদ্বোধনী পর্ব ঘিরে এখন থেকেই তুঙ্গে উঠেছে সিনেপ্রেমীদের উন্মাদনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *