পকেট থেকে খরচ করে ইউরোপ জয়! সাই-এর চরম আর্থিক অনটনের মুখে দাঁড়িয়েও কোন ইতিহাস গড়লেন সিন্ধু-লক্ষ্য?

জার্মানির হাইলো ওপেনে দুরন্ত পারফরম্যান্সে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ভারতের সফল ইউরোপীয় ব্যাডমিন্টন অভিযান শেষ করলেন পিভি সিন্ধু ও লক্ষ্য সেন। কিন্তু এই চোখধাঁধানো সাফল্যের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অন্য গল্প— যা যেমন গৌরবের, তেমনই তীব্র আর্থিক অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার। ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, ফ্রান্স ও জার্মানি— ইউরোপের এই চারটি কঠিন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে ভারতীয় শাটলারদের অনেকেই নিজেদের পকেট থেকে যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার খরচ বহন করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ, গোটা ইউরোপ সফরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করেনি স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI)।
শেষ মুহূর্তের ধাক্কা ও অলিম্পিক পদকজয়ীর বিস্ময়:
একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর ফিনল্যান্ডের ভান্তায় ‘আর্কটিক ওপেন’ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে খেলোয়াড়দের জানানো হয় যে তারা কোনো অর্থসাহায্য পাচ্ছেন না। ফলে শেষ মুহূর্তে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা করা শাটলারদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। এমনকি দেশের তারকা তথা অলিম্পিক পদকজয়ী পিভি সিন্ধুও এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। নিজের খরচের পাশাপাশি তাঁকে অবশ্য সাহায্য করেছিল ‘অলিম্পিক গোল্ড কোয়েস্ট’।
সিন্ধু সাফ জানিয়েছেন, “বিষয়টি জানার পর আমি বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তবে অর্থসাহায্য না পেলেও প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়ার কথা আমি একবারের জন্যও ভাবিনি। আমার কাছে প্রথম লক্ষ্য ছিল দেশের হয়ে খেলা এবং নিজের পারফরম্যান্সের উন্নতি করা।”
প্রস্তুতিতে টান ও কোচরহীন লড়াই:
এই তীব্র আর্থিক সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়েছিল খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতিতে। বাজেটের টানে অনেক শাটলার তাঁদের ব্যক্তিগত কোচকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেননি। যেমন, ফ্রেঞ্চ ওপেনে বিশ্বের তিন নম্বর তারকা আকানে ইয়ামাগুচিকে হারানো অস্মিতা চালিহার পাশে কোচের পরিবর্তে গ্যালারিতে ছিলেন সতীর্থ ঈশারানি বড়ুয়া। একইভাবে ডেনমার্ক ওপেনেও কোচ ছাড়াই কোর্টে নামতে হয়েছিল তানভি শর্মাকে।
সাই ও ব্যাডমিন্টন সংস্থার অবস্থান:
এই জলঘোলা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভারতীয় ব্যাডমিন্টন মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ক্রীড়াপ্রেমীদের একাংশের ধারণা ছিল, এশিয়ান গেমসে ভারতের আশানুরূপ ফল না পাওয়ার ফলেই হয়তো এই অর্থসাহায্য বন্ধ রাখা হয়েছে। কারণ, ২০১৪ সালের পর এই প্রথম এশিয়ান গেমসের ব্যক্তিগত ব্যাডমিন্টন বিভাগে কোনো পদক পায়নি ভারত।
তবে সেই অভিযোগ সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছে স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI)। সংস্থার এক শীর্ষ আধিকারিক দাবি করেছেন যে, এশিয়ান গেমসের ফলাফলের সঙ্গে এই অর্থ বরাদ্দ না করার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। নিয়ম অনুযায়ী, যে কোনো প্রতিযোগিতা শুরুর অন্তত ৩০ দিন আগে খেলোয়াড়দের নাম ও আনুসাঙ্গিক খরচের প্রস্তাব জমা দিতে হয় ব্যাডমিন্টন অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়াকে (BAI)। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সেই প্রস্তাব জমা না পড়ায় এই প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
যদিও আগামী প্রতিযোগিতাগুলির জন্য অর্থসাহায্য ফের চালু করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে, তবে ইউরোপ সফরে খেলোয়াড়দের পকেট থেকে খরচ হওয়া অর্থ আর ফেরত দেওয়া হবে না বলেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে সাই।
প্রতিকূলতা পেরিয়ে সোনা জয়:
সমস্ত প্রশাসনিক বাধার প্রাচীর ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস গড়েছেন ভারতীয় শাটলাররা। ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনালে দুর্দান্ত লড়াই করে পৌঁছেছিলেন পিভি সিন্ধু। ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আন সে-ইয়ংয়ের কাছে হারলেও হাইলো ওপেনে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে ট্রফি জিতে নেন তিনি। অন্যদিকে, অস্মিতা চালিহার হাতে ইয়ামাগুচির পরাজয় এবং অনমোল খারবের হাইলো ওপেনের সেমিফাইনালে ওঠার কৃতিত্বও ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
শেষ পর্যন্ত এই পুরো সফরের মুকুটে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে ওঠে লক্ষ্য সেন ও পিভি সিন্ধুর জোড়া খেতাব জয়। পুরুষদের সিঙ্গলসে চ্যাম্পিয়ন হয়ে টানা এক বছরের শিরোপা-খরা কাটিয়ে ফর্মে ফেরেন লক্ষ্য সেন। আর মহিলাদের সিঙ্গলসে ট্রফি জিতে চলতি বছরে নিজের দ্বিতীয় বিডব্লিউএফ ওয়ার্ল্ড ট্যুর শিরোপা ঘরে তোলেন সিন্ধু। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো ক্যালেন্ডার বছরে সুপার ৫০০ বা তার উপরের স্তরের দুটি খেতাব জিতলেন তিনি। এই অভাবনীয় জয়ের সুবাদে ওয়ার্ল্ড ট্যুর ফাইনালসে যোগ্যতা অর্জনের পথ যেমন প্রশস্ত হয়েছে, তেমনই বিশ্ব ক্রমতালিকায় ছয় নম্বরে উঠে এলেন দেশের এই ব্যাডমিন্টন তারকা।