ঘরে বসে ওয়াকি-টকি কিনছেন? সরকার কিন্তু সতর্ক করছে, অজান্তেই বড় বিপদে পড়ছেন না তো?

কোনো বড় ইভেন্ট সামলানো হোক কিংবা শহরের রাস্তায় ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই যোগাযোগের সবচেয়ে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো ওয়াকি-টকি। দেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে বড় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা বা সুরক্ষাকর্মীরা অবাধ যোগাযোগের জন্য এই বিশেষ ডিভাইসের ওপরই নির্ভর করেন। তবে বর্তমানে বিভিন্ন জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সাধারণ ইলেকট্রনিক্স পণ্যের মতোই ওয়াকি-টকি অত্যন্ত সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ কি চাইলেই যখন-তখন এবং যেখানে-সেখানে এই ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন?

কীভাবে কাজ করে এই ওয়াকি-টকি?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগে এটি কীভাবে কাজ করে তা বুঝে নেওয়া জরুরি। ওয়াকি-টকি মূলত একটি টু-ওয়ে রেডিও ট্র্যান্স-রিসিভার ডিভাইস। এটি নির্দিষ্ট রেডিও তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে একজনের সাথে অন্যজনের সরাসরি বার্তা আদান-প্রদান করে।

কোন ওয়াকি-টকি ঠিক কত ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব থাকে সরকারের ওপর। কারণ নির্দিষ্ট কিছু ফ্রিকোয়েন্সির জন্য কেন্দ্র সরকারের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয় এবং তার জন্য লাইসেন্সও দেওয়া হয়। তবে বিপত্তি ঘটছে অনলাইনে বিক্রির ক্ষেত্রে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলিতে যেসব ওয়াকি-টকি বিক্রির জন্য রাখা হয়, তার বহু বিজ্ঞাপনেই ডিভাইসের সঠিক অপারেটিং ফ্রিকোয়েন্সির বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে না।

ই-কমার্স সংস্থাগুলিকে কড়া বার্তা ও জরিমানা

সম্প্রতি এই অনিয়ম ও তথ্য গোপনের বিষয়টিতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আইনি পদক্ষেপ করেছে সেন্ট্রাল কনজিউমার প্রোটেকশন অথরিটি (CCPA)। গত ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক নির্দেশিকায় সিসিডিএ জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন নামী ই-কমার্স সাইটে তালিকাভুক্ত করা প্রায় ১৬,৭৯০টি ওয়াকি-টকি মডেলে কোনো সার্টিফাইড অপারেটিং ফ্রিকোয়েন্সির উল্লেখ করা হয়নি। ভুল ও অস্পষ্ট তথ্য দিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করার অপরাধে বেশ কিছু বিক্রেতা সংস্থাকে মোটা অঙ্কের জরিমানাও করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি সিসিডিএ-র প্রকাশ করা একটি পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অনলাইন কেনাকাটার সাইট থেকে প্রায় ৬৫,৩৯১টি ওয়াকি-টকি বিক্রি করা হয়েছে, যেগুলির বিজ্ঞাপনে কোনো সঠিক অপারেটিং রেঞ্জ লেখা ছিল না। এর মধ্যে বহু ডিভাইস সরকারি ফ্রিকোয়েন্সি সংক্রান্ত কড়া নিয়ম লঙ্ঘন করে তৈরি ও বিক্রি করা হয়েছে।

ফ্রিকোয়েন্সি সংক্রান্ত আইন ও লাইসেন্সের আসল সত্য

দেশের প্রচলিত ২০১৮ সালের আইন অনুযায়ী, ৪৪৬ থেকে ৪৪৬.২ মেগাহার্টজ (MHz) ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জের মধ্যে চলা ওয়াকি-টকি ব্যবহারের জন্য আলাদা করে কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। তবে এই নির্দিষ্ট ব্যান্ডের বাইরে থাকা যে কোনো ফ্রিকোয়েন্সিতে পরিচালিত ওয়াকি-টকি ব্যবহার করতে হলে সরকারের থেকে পৃথক অনুমোদন ও লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক।

সম্প্রতি পাওয়া সরকারি নোটিসে দেখা গেছে, অনলাইনের বহু বিজ্ঞাপনে সম্পূর্ণ ভুল দাবি করা হচ্ছে। যেমন, একটি বিক্রেতা সংস্থার দাবি—৪০০ থেকে ৪৭০ MHz ফ্রিকোয়েন্সির ওয়াকি-টকিতে কোনো লাইসেন্স লাগবে না। অন্য একটি সংস্থা দাবি করেছে—৪০০ থেকে ১২০০ MHz পর্যন্ত রেঞ্জে লাইসেন্স ছাড়াই কথা বলা যাবে। এমনকি ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিশাল কভারেজ থাকা বেশ কিছু শক্তিশালী ওয়াকি-টকিকে ই-কমার্সে অতি চালাকির সাথে ‘সাধারণ খেলনা’ হিসেবে লিস্টিং করে বিক্রি করা হচ্ছে, যা আইনত মারাত্মক অপরাধ।

তা হলে সাধারণ মানুষ কি যে কোনো লাইসেন্সহীন ওয়াকি-টকি চালাতে পারবেন?

উত্তর হলো—একদমই না। সাধারণ মানুষ যে কোনো ওয়াকি-টকি ইচ্ছা হলেই কিনতে বা ব্যবহার করতে পারেন না।

যেসব ডিভাইস লাইসেন্সমুক্ত হিসেবে ছাড় পায়, সেগুলিকে ৪৪৬ থেকে ৪৪৬.২ MHz ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করার পাশাপাশি আরও একাধিক প্রযুক্তিগত শর্ত পূরণ করতে হয়:

  • রেডিয়েটিভ পাওয়ার: ডিভাইসটির রেডিয়েটিভ ক্ষমতা অবশ্যই ৫০০ মিলিওয়াট (mW)-এর কম হতে হবে।

  • চ্যানেল স্পেসিং: চ্যানেল স্পেসিং ৬.২৫ KHz থেকে ১২.৫ KHz-এর নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকতে হবে।

  • ব্যবহারের উদ্দেশ্য: এটি কেবল ব্যবহারকারীদের মধ্যে সরাসরি ও ব্যক্তিগত সাধারণ যোগাযোগের জন্যই ব্যবহার করা যাবে, কোনো বাণিজ্যিক বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিকিউরিটি নেটওয়ার্ক হিসেবে নয়।

অতএব, ই-কমার্স ওয়েবসাইট থেকে কম দামে আকর্ষিত হয়ে না জেনে ওয়াকি-টকি কেনার আগে ফ্রিকোয়েন্সি ও সরকারি লাইসেন্সের বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া দরকার, নয়তো অজান্তেই আইনের কোপে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *