বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ৫০০ কারখানা বন্ধ, রাস্তায় আন্দোলনে ১০ লাখ শ্রমিক, স্তব্ধ বাংলাদেশ

আবারও বড়সড় অশান্তির মুখে বাংলাদেশ। আর এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের শিল্পাঞ্চল। ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিক। বহু জায়গায় রাস্তা অবরোধ, পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো উত্তপ্ত ঘটনা ঘটেছে। এই আন্দোলনের জেরে রবিবার বাংলাদেশের অন্তত ৫২৯টি পোশাক কারখানায় কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BGMEA) হিসেব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯ লক্ষ ৮৭ হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ করে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। সোমবার দিনভর নানা চেষ্টা চালিয়েও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়নি।

কেন হঠাৎ রাস্তায় নামলেন পোশাক শ্রমিকরা?

আন্দোলনকারী শ্রমিকদের মূল দাবি— তাঁদের মাসিক ন্যূনতম বেতন ১২,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। শ্রমিকদের বক্তব্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ প্রতিদিন যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে বর্তমান বেতনের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বিশেষত ঢাকা, গাজীপুর ও আশুলিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলে আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে বাসা ভাড়াতে। এই সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানো এখন কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ৩১ অক্টোবর থেকে মীরপুর, আশুলিয়া, সাভার এবং গাজীপুরে এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে রবিবার পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। একাধিক জায়গায় পুলিশের গাড়ি এবং কারখানার সিকিউরিটি বুথে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের সেল, জলকামান এবং সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীও (BGB) মোতায়েন করা হয়েছে।

সোমবারও রণক্ষেত্র ঢাকা ও সংলগ্ন এলাকা

সোমবার সকালে কারখানা খোলার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে ফের বিক্ষোভ দানা বাঁধে। মীরপুরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করেন। আশুলিয়াতেও দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়েছে গাজীপুরে; সেখানে ঢাকা-টাঙ্গাইল হাইওয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

অর্থনীতির মূল স্তম্ভ নিয়ে চরম উদ্বেগ

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল কাণ্ডারি হলো এই তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) শিল্প। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্বখ্যাত পোশাক এবং জুতো নির্মাতা সংস্থা বাংলাদেশ থেকে আউটসোর্সিং করে থাকে। সস্তায় দক্ষ শ্রমিক পাওয়ার সুবিধা থাকায় আন্তর্জাতিক বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো এই দেশের ফ্যাক্টরিগুলির ওপর নির্ভরশীল। তবে বিশ্ববাজারে বহু চড়া দামে এসব জামাকাপড় বিক্রি হলেও দিনরাত ঘাম ঝরানো শ্রমিকরা পান নামমাত্র পারিশ্রমিক।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে শুধুমাত্র এই গার্মেন্টস সেক্টর থেকেই প্রায় ৩৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ, যা সেদেশের মোট রফতানি আয়ের ৮১ শতাংশেরও বেশি। স্বভাবতই, এই খাত দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক রফতানি বরাত বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড়সড় ধ্বসের মুখে ফেলে দিতে পারে।

পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সেদেশের সরকারের পক্ষ থেকে ছয় সদস্যের একটি নতুন লেবার বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তবে একদিকে শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার অনড় দাবি, অন্যদিকে মালিকপক্ষের আর্থিক লোকসানের ভয়—এই টানাপোড়েনে সমস্যার সমাধান ঠিক কীভাবে হবে, তা নিয়ে এখনও প্রশ্নচিহ্ন থেকে যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *