রাশিয়ার বুকে ১,৪০০ কিমি ভেতরে ঢুকে হামলা! কীভাবে পুতিনের ড্রিম প্রজেক্ট গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইউক্রেনের ড্রোন?

যুদ্ধক্ষেত্রের সীমান্ত ছাড়িয়ে এবার রাশিয়ার একেবারে হৃদপিণ্ডে আঘাত হানছে ইউক্রেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী দূরপাল্লার ড্রোন (Long-range Drones) প্রযুক্তির বিকাশ ঘটিয়ে রাশিয়ার সীমান্ত থেকে শত শত কিলোমিটার ভেতরের তেল পরিশোধনাগার ও জ্বালানি পরিকাঠামো ধ্বংস করতে শুরু করেছে।

সামরিক সূত্রের খবর, ইউক্রেন সীমান্ত এবং মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় ৮০০ থেকে ১,৪০০ কিলোমিটার দূরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুশ শিল্পাঞ্চলে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। রাশিয়ার অর্থব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ এনার্জি সেক্টরকে পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যেই যে এই ঝটিকা ড্রোন অভিযান, তা এক প্রকার স্পষ্ট।

ইউক্রেনের ড্রোন হামলার মুখে পড়ল রাশিয়ার যেসব মেগা অয়েল রিফাইনারি
রাশিয়ার ভলগা অঞ্চল, উরাল পার্বত্য অঞ্চল এবং প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অবস্থিত বহু কৌশলগত রিফাইনারিতে ড্রোনের আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:

১. কস্তোভো (NORSI) তেল পরিশোধনাগার – নিজনি নভগোরোদ অঞ্চল
ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত এই কস্তোভো রিফাইনারিটি রাশিয়ার অন্যতম প্রধান তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। সাম্প্রতিক ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে এই মেগা প্রজেক্টটি চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।

২. নভোকুইবিশেভস্ক তেল পরিশোধনাগার – সামারা অঞ্চল
ভলগা অঞ্চলে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি রাশিয়ার তেল সরবরাহ নেটওয়ার্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাশিয়ার এত গভীরে ইউক্রেনের ড্রোন পৌঁছে যাওয়া প্রমাণ করে যে, ড্রোন অভিযানে কতটা অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটিয়েছে ইউক্রেন।

৩. বাশনেফ্ট-নোভোয়েল রিফাইনারি – উফা, বাশকোর্তোস্তান
রাশিয়ার ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে উফা অঞ্চলে অবস্থিত এই পরিশোধনাগারটি ড্রোনের নিশানায় আসা ইউক্রেনের নিখুঁত দূরপাল্লার আনম্যান্ড এরিয়াল ভেহিকেল (UAV)-এর অবিশ্বাস্য ক্ষমতার বড় প্রমাণ।

৪. ওরস্কনেফতেওরগসিনতেজ রিফাইনারি – ওরেনবার্গ অঞ্চল
এ যাবৎকালের সবচেয়ে দূরবর্তী যে লক্ষ্যবস্তুতে ইউক্রেন আঘাত হেনেছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম। ইউক্রেন থেকে প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই কেন্দ্রটিতে হামলা চালিয়ে ইউক্রেন বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে রাশিয়ার কোনো প্রান্তই আর সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।

রাশিয়ার মস্কো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ— সর্বত্র ড্রোনের দাপট
শুধু ভলগা বা উরাল নয়, ইউক্রেনের এই আত্মঘাতী ড্রোনগুলো রাশিয়ার ক্রাসনোদার, রস্তভ, ভলগোগোরাড এবং স্বয়ং রাজধানী মস্কো ও ইয়ারোস্লাভলের নিকটবর্তী শিল্পাঞ্চলেও তাণ্ডব চালিয়েছে। এমনকি বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত উস্ট-লুগা এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল উপকূলীয় পরিকাঠামোর ওপরেও কড়া নজর রাখছে এই ড্রোনগুলি।

এর ফলে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি উৎপাদন ও পেট্রোলিয়াম পরিবহনে চরম ধাক্কা লেগেছে।

কত দূর যেতে পারে ইউক্রেনের এই ধ্বংসাত্মক ড্রোন?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো ইতিমধ্যেই ৮০০ থেকে ১,৪০০ কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যে সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। অবশ্য ড্রোনের মডেল, প্যালোড (বোমার ওজন), বাতাসের গতিবেগ ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে এর রেঞ্জ কম-বেশি হয়।

তবে সাইবেরিয়া ও রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের (Far East) রিফাইনারিগুলো ইউক্রেন থেকে প্রায় ৩,৫০০ থেকে ৬,৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় সেগুলো এখনও ড্রোনের সীমানার বাইরে রয়েছে।

সারসংক্ষেপ:
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যত গড়াচ্ছে, ইউক্রেন বুঝতে পেরেছে যে পুতিনের যুদ্ধ চালনোর মূল রসদ জোগায় তাঁদের তেল ও এনার্জি খাত। তাই সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করার পাশাপাশি রাশিয়ার অর্থনীতির মেরুদণ্ড অর্থাৎ তেল পরিশোধনাগারগুলোকে ধুলিসাৎ করতেই এই ড্রোন কৌশল বেছে নিয়েছে ইউক্রেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *