স্বাস্থ্যসাথীতে বিশাল কেলেঙ্কারি! ২৫-৩০ লক্ষ ভুয়ো কার্ড, অস্ত্রোপচার ছাড়াই কোটি কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ!

রাজ্যজুড়ে স্বাস্থ্যসাথী (Swasthya Sathi) প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য সামনে এল। সরকারি স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে অস্ত্রোপচার না করেই ভুয়া বিল বানিয়ে সরকারের কোষাগার থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বর্তমান প্রশাসন। স্বাস্থ্যভবন ও সরকারের শীর্ষমহলের দাবি, এই মেগা দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছে এক বিরাট চক্র, যার নিশানা সরাসরি পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দিকে।
২৫ থেকে ৩০ লক্ষ ভুয়ো কার্ডের হদিশ
স্বাস্থ্যদপ্তর ও মন্ত্রক সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা চালুর পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে যখন সরকারি যাচাই ও সমীক্ষার কাজ শুরু হয়, তখনই আসল তথ্য সামনে আসে। দেখা যায়, রাজ্যে প্রায় ২৫ থেকে এ ৩০ লক্ষ ভুয়ো স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ও উপভোক্তার অস্তিত্ব রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় কটাক্ষ করে বলেন, “সবেমাত্র ওপেনিং ব্যাটসম্যান নেমেছে, তাতেই এই পরিমাণ গরমিল ও দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে। পুরো ইনিংস খেলা এখনও বাকি। এটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র!”
কীভাবে চলত এই বেনজির জালিয়াতি?
তদন্তে নেমে স্বাস্থ্যভবন ও ফরেন্সিক অডিট টিম যে সমস্ত ভয়ানক তথ্য উদ্ধার করেছে, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য:
ভুয়ো রোগী ও অস্তিত্বহীন নার্সিংহোম: এমন সব রোগীর নামে বিল পাশ করানো হয়েছে, যাঁরা আদতে হাসপাতালেই ভর্তি হননি। এমনকি বহু ক্ষেত্রে যে নার্সিংহোমের নামে বিল তৈরি হয়েছে, বাস্তবে সেই নার্সিংহোমের কোনো অস্তিত্বই নেই!
ছুরি-কাঁচি ছাড়াই অস্ত্রোপচার: অনেক ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে ছুরি-কাঁচি বা অস্ত্রোপচার না করা সত্ত্বেও বড় অঙ্কের সার্জারির বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। আবার মেডিসিন বিভাগে সাধারণ জ্বর বা পেটের সাধারণ সমস্যায় ভর্তি রোগীরও অস্ত্রোপচার দেখানো হয়েছে।
প্যাকেজে নয়ছয়: ৪০ হাজার টাকার অস্ত্রোপচারের প্যাকেজকে বাড়িয়ে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দেখিয়ে আবেদন করা হতো। অভিযোগ, স্বাস্থ্যদপ্তরের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই এই সমস্ত ভুয়া বিলের অনুমোদন মিলত এবং সেই টাকার মোটা অংশ ঘুঘুর চাকে ভাগ হয়ে যেত।
টিপিএ-র ব্ল্যাকমেল ও হুমকি: থার্ড পার্টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বা টিপিএ (TPA)-গুলি নার্সিংহোমগুলিকে হুমকি দিয়ে পেমেন্টের ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কাটমানি বা কমিশন আদায় করত বলে অভিযোগ। টাকা না দিলে হাসপাতালের পেমেন্ট আটকে দেওয়া হতো।
পরিবারের বাকি কার্ড ব্লক: চার সদস্যের পরিবারের একজনের ছোটখাটো চিকিৎসা হলেও বাকি তিনজনের কার্ডের অপব্যবহার করে ভুয়া বিল তোলার অভিযোগ উঠেছে।
কীভাবে ফাঁস হলো এই দুর্নীতি?
প্রাথমিকভাবে বর্ধমানের একটি মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতালের বিলে অসঙ্গতি ধরা পড়ার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। ১৪৪টি স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের সঙ্গে চিকিৎসার নথির কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপরই দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি ও বর্ধমান সহ একাধিক জেলার বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমকে শোকজ করা হয়।
বর্তমানে দুটি টিপিএ-কে ইতিমধ্যেই কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং একাধিক সন্দেহজনক বিমা সংস্থাকে নজরে রেখে সম্পূর্ণ ‘ফিন্যান্সিয়াল ফরেনসিক অডিট’ চালানো হচ্ছে। তবে এই বিপুল পরিমাণ দুর্নীতির টাকা শেষ পর্যন্ত কার পকেটে বা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, তা নিয়ে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে রাজনৈতিক তরজা চরম আকার ধারণ করেছে।