পড়াশোনায় বিরাট বড় পরিবর্তন! ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি রাজ্যে? মাস্টারমশাইদের জন্য জারি হচ্ছে কঠিন নিয়ম!

প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার মান উন্নত করতে এবং পঠনপাঠনের ক্ষয় রোধ করতে ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি চালুর চিন্তাভাবনা করছে রাজ্য সরকার। সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন এই নতুন পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন।

কী এই ‘এক ক্লাস, এক শিক্ষক’ নীতি? প্রস্তাবিত নীতি অনুযায়ী, প্রাথমিক স্কুলের প্রতিটি নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য একজন করে স্থায়ী শ্রেণি-শিক্ষক বা ক্লাস টিচার নিযুক্ত থাকবেন। সংশ্লিষ্ট শ্রেণির সমস্ত বিষয় পড়ানোর দায়িত্ব থাকবে তাঁর ওপরই। কেবল তা-ই নয়, বছর শেষে পড়ুয়ারা কতটা পড়াশোনা শিখল কিংবা তাদের সার্বিক বিকাশ কতখানি হলো, তার সমস্ত দায়ভার ও জবাবদিহিতা থাকবে সেই নির্দিষ্ট শিক্ষকের ওপরই।

শিক্ষকমহলে একগুচ্ছ প্রশ্ন ও উদ্বেগ সরকারের এই নতুন ভাবনা সামনে আসতেই শিক্ষা শিবিরে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। শিক্ষকদের একাংশ ও একাধিক শিক্ষক সংগঠনের মতে, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো না বানিয়ে তড়িঘড়ি এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

  • প্রধান শিক্ষকদের দায়িত্ব: শিক্ষক সংগঠনগুলির দাবি, প্রধান শিক্ষকদের পঠনপাঠনের পাশাপাশি প্রচুর প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হয়। তাই তাঁদের নির্দিষ্ট শ্রেণি-শিক্ষকের তালিকায় রাখা অবাস্তব।

  • ছুটি বা অসুস্থতার বিকল্প: কোনো শিক্ষক হঠাৎ অসুস্থ হলে বা ছুটিতে থাকলে তাঁর ক্লাস কে নেবেন, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা নেই। শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকারের মতে, “শিক্ষক ছুটিতে থাকলে সেই ক্লাস মুখ থুবড়ে পড়বে। প্রশাসনিক বাস্তবতা ও বিকল্প ব্যবস্থা না ভেবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন।”

  • ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত: নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রুবশেখর মণ্ডলের বক্তব্য, কোনো ক্লাসে ২০ জনের বেশি পড়ুয়া থাকলে একজন শিক্ষকের পক্ষে সবার প্রতি সমান নজর দেওয়া সম্ভব নয়।

৩ জন শিক্ষক দিয়ে ৫টি ক্লাস? সারপ্লাস বদলির প্রস্তাব পরিস্থিতি সামাল দিতে ও অনুপাত ঠিক রাখতে সারপ্লাস (অতিরিক্ত) শিক্ষকদের অন্য স্কুলে বদলি করার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, আপাতত প্রতিটি প্রাথমিক স্কুলে অন্তত ৩ জন করে শিক্ষক রাখার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এতেও কাটছে না ধোঁয়াশা। শিক্ষকদের বক্তব্য, বহু প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি যুক্ত রয়েছে। ১ম থেকে ৫মে পৌঁছানো একটি স্কুলে মাত্র ৩ জন শিক্ষক দিয়ে কীভাবে ৫টি পৃথক শ্রেণির পঠনপাঠন চলবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চের দাবি, শিক্ষকদের দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে শ্রেণি বণ্টন করা উচিত। স্নাতকোত্তর বা স্নাতক পাশ শিক্ষককে নিচু ক্লাসে এবং কম যোগ্যতাসম্পন্ন কাউকে ওপরের ক্লাসে দিলে শিক্ষার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এছাড়া, কেবল শিক্ষকের ঘাড়ে দায় না চাপিয়ে অভিভাবকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

সমর্থনে বিজেপি শিক্ষক সেল অন্যদিকে, সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন বিজেপি শিক্ষক সেলের সহ-আহ্বায়ক তথা প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের অ্যাডহক কমিটির সদস্য পিন্টু পাড়ুই। তাঁর মতে, “স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে ফের ট্র্যাকে ফেরাতে এই সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। শিক্ষক ভাইরা আরও দায়িত্ব নিলে ছাত্ররাই উপকৃত হবে। নতুন নিয়োগ হলে বাকি সমস্যাগুলোও দ্রুত মিটে যাবে।”

সব মিলিয়ে, শিক্ষামন্ত্রীর এই নতুন প্রস্তাবিত নীতি রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন মোড় আনলেও, তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা ও পরিকাঠামোগত ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *