বিজেপির হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো পাকা আসন! শেষ মুহূর্তের নাটকীয় ভোট পরিবর্তনে দ্বারভাঙায় বাজিমাত আরজেডির

বিহার বিধান পরিষদ নির্বাচনে এক অপ্রত্যাশিত ও চাঞ্চল্যকর ফল উপহার দিল দ্বারভাঙা গ্র্যাজুয়েটস কেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরে যে আসনটি ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখান থেকে গেরুয়া শিবিরকে হটিয়ে দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে নিল লালুপ্রসাদ যাদবের দল রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD)। বিজেপির বিদায়ী এমএলসি তথা শক্তিশালী প্রার্থী সর্বেশ কুমারকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন আরজেডি প্রার্থী অনিল কুমার ঝা। দীর্ঘ প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে ভোট গণনার পর বৃহস্পতিবার এই ফলাফল ঘোষণা করা হয়। তবে এই জয়ের মূল চাবিকাঠি ছিল গণনার শেষ পর্যায়ে পছন্দের প্রার্থীদের ভোট বা প্রেফারেনশিয়াল ভোটের নাটকীয় হাতবদল।

কীভাবে বিজেপির হাত থেকে আসন ছিনিয়ে নিল আরজেডি?
এই আসনে মোট ৪০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যার জন্য গত ২৩ অক্টোবর ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছিল। গণনার প্রথম দিককার রাউন্ডগুলিতে বিজেপির সর্বেশ কুমার লাগাতার এগিয়ে ছিলেন এবং আরজেডি প্রার্থী অনিল কুমার ঝা পিছিয়ে ছিলেন। কিন্তু খেলার আসল মোড় ঘোরে গণনার ৩৯তম রাউন্ডে।

সেসময় তৃতীয় স্থানে থাকা ‘জন সুরাজ পার্টি’-র প্রার্থী মহম্মদ ইমতিয়াজ নুরানিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ৩৮তম রাউন্ডের শেষে বিজেপি প্রার্থী সর্বেশ কুমারের ঝুলিতে যেখানে ২০,০৩৩ ভোট ছিল এবং অনিল কুমার ঝা পেয়েছিলেন ১৯,০২৯ ভোট (অর্থাৎ বিজেপি ১,০৫৮ ভোটে এগিয়ে ছিল), সেখানেই সমীকরণ পাল্টে যায়। নুরানির সমর্থকদের পছন্দের ভোট অন্য প্রার্থীদের মধ্যে হস্তান্তরিত হতেই বড়সড় বদল আসে।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নুরানির সমর্থকদের হস্তান্তরযোগ্য ভোটের বড় অংশ—প্রায় ২,৯০০টি ভোট পান অনিল কুমার ঝা। অন্যদিকে, সর্বেশ কুমারের ঝুলিতে যায় ১,৩৬৩টি ভোট। এর ফলে এক ধাক্কায় এগিয়ে যান আরজেডি প্রার্থী। শেষ পর্যন্ত রোমহর্ষক লড়াইয়ের পর ৫৩৩ ভোটের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন তিনি।

কী এই সিঙ্গল ট্রান্সফারেবল ভোট বা STV পদ্ধতি?
সাধারণ নির্বাচনে ভোটাররা কেবল একজন প্রার্থীকে ভোট দিলেও, বিধান পরিষদ নির্বাচনে ব্যবহৃত সিঙ্গল ট্রান্সফারেবল ভোট (STV) পদ্ধতিতে ভোটাররা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী প্রার্থীদের ক্রমানুসারে (Preference) সাজাতে পারেন। ব্যালটে প্রথম, দ্বিতীয় ও পরবর্তী পছন্দের প্রার্থীদের নামের পাশে ক্রম উল্লেখ করা হয়।

নির্দিষ্ট কোটা পূরণ করতে না পারলে সবচেয়ে কম ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীকে একে একে বাদ দেওয়া হয় এবং তাঁদের ভোটারদের পরবর্তী পছন্দের প্রার্থীর কাছে ভোট হস্তান্তরিত হয়। দ্বারভাঙার নির্বাচনে এই ভোট হস্তান্তরই শেষ পর্যন্ত গেমচেঞ্জার হিসেবে প্রমাণিত হয়।

বিহারের রাজনীতিতে এই ফলাফলের তাৎপর্য
এই জয়ের ফলে বিহার বিধান পরিষদের আসন বণ্টনের পরিসংখ্যানেও বড় পরিবর্তন এসেছে। গ্র্যাজুয়েটস ও টিচার্স কেন্দ্র মিলিয়ে হওয়া মোট আটটি আসনের মধ্যে বিজেপি ও আরজেডি দুটি করে আসন জিতেছে। জনতা দল ইউনাইটেড (JDU) এবং জন সুরাজ পার্টি একটি করে আসনে জয়ী হয়েছে, এবং বাকি দুটি আসনে জয় পেয়েছেন নির্দল প্রার্থীরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বারভাঙার এই ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই অঞ্চলে বরাবরই এনডিএ-র প্রবল আধিপত্য রয়েছে। লোকসভা নির্বাচনে এখানকার সাংসদ বিজেপির গোপালজি ঠাকুর বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন, এমনকি ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও জেলার ১০টির মধ্যে ৯টি আসনেই জিতেছিল এনডিএ। সেই বিজেপির দুর্গেই আরজেডির এই জয় যেমন দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনই প্রমাণ করে দিল যে দীর্ঘ ব্যবধানও শেষ মুহূর্তের ‘প্রেফারেন্সিয়াল ভোট’-এর জাদুতে কীভাবে রাতারাতি বদলে যেতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *