রাতে সুস্থ শরীরে ঘুমাতে গেলেন, কিন্তু সকালে উঠে কথা জড়াচ্ছে? অজান্তেই মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হননি তো?

একদম সুস্থ-স্বাভাবিক শরীরে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে গিয়েছেন, অথচ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দেখা গেল মুখ বা শরীরের একপাশ অবশ লাগছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কিংবা চোখে ঝাপসা দেখছেন! এমন কোনো লক্ষণ নিজের বা পরিজনের মধ্যে দেখলে ভুলেও অবহেলা করবেন না। চিকিৎসকদের মতে, ঘুমন্ত অবস্থাতেই হয়তো আপনার মস্তিষ্কে অজান্তে থাবা বসিয়েছে মারাত্মক স্ট্রোক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ওয়েক-আপ স্ট্রোক’ (Wake-up Stroke)।

কী এই ‘ওয়েক-আপ স্ট্রোক’?
যখন মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালীতে রক্ত প্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় (Clot) কিংবা রক্তনালী ফেটে রক্তপাত শুরু হয়, তখন স্ট্রোক ঘটে। জাগ্রত অবস্থায় স্ট্রোক হলে রোগী বা আশেপাশের মানুষ দ্রুত তা বুঝতে পারেন। কিন্তু ঘুমের মধ্যে এই দুর্ঘটনা ঘটলে ঘুম থেকে না ওঠা পর্যন্ত বিষয়টি কারোরই জানার উপায় থাকে না। ফলে মূল বিপত্তি তৈরি হয় চিকিৎসার সময় নির্বাচন নিয়ে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘লাস্ট নোন ওয়েল টাইম’-এর গুরুত্ব
স্ট্রোকের মতো জরুরি চিকিৎসায় প্রতিটি সেকেন্ড অত্যন্ত মূল্যবান। রোগী ঠিক কোন সময় পর্যন্ত পুরোপুরি সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সেটিকে বলা হয় ‘লাস্ট নোন ওয়েল টাইম’ (Last Known Well Time)। ‘ওয়েক-আপ স্ট্রোক’-এর ক্ষেত্রে এটি সাধারণত ধরা হয় রোগী রাতে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগের সময়টিকে। যদিও স্ট্রোকের সঠিক মুহূর্তটি অজানা থাকে, তবুও আধুনিক ‘ব্রেন ইমেজিং’ (CT Scan/MRI) পরীক্ষা এবং জরুরি ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।

ওয়েক-আপ স্ট্রোকের প্রধান ঝুঁকি ও কারণসমূহ

উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure): অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপই স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান কারণ।

অন্যান্য শারীরিক সমস্যা: ডায়াবেটিস, হাই কোলেস্টেরল এবং ধূমপানের অভ্যাস থাকলে রক্তনালী সংকুচিত হয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন (Atrial Fibrillation): এটি মূলত হৃৎস্পন্দনের মারাত্মক অনিয়ম। এর ফলে হৃদপিণ্ডে জমাট বাঁধা রক্ত রক্তের স্রোতে ভেসে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালীতে পৌঁছে রক্ত প্রবাহ পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিতে পারে।

বিপদ এড়াতে মনে রাখুন জীবনদায়ী ‘BEFAST’ ফর্মুলা:

স্ট্রোকের লক্ষণগুলো দ্রুত চিনে নিয়ে রোগীকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসকরা BEFAST পদ্ধতি মনে রাখার পরামর্শ দেন:

B (Balance / ভারসাম্য): হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা, হঠাৎ মাথা ঘোরা বা সোজা হয়ে হাঁটতে সমস্যা হওয়া।

E (Eyes / চোখ): হঠাৎ কোনো এক বা উভয় চোখে ঝাপসা দেখা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা একটি জিনিস দুটো দেখা (Double Vision)।

F (Face / মুখ): হাসতে গেলে, কথা বলতে গেলে বা মুখ খুললে মুখের যেকোনো একপাশ বেঁকে যাওয়া।

A (Arms / হাত): হাত বা পা অবশ লাগা, অথবা একটি হাত উপরে তুলে রাখার চেষ্টা করেও ধরে না রাখতে পেরে নিচে পড়ে যাওয়া।

S (Speech / কথা): কথা স্পষ্ট করে বলতে না পারা, জড়িয়ে যাওয়া বা অপরের সহজ কথাও বুঝতে না পারা।

T (Time / সময়): ওপরের যেকোনো একটি লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে রোগীকে অবিলম্বে স্ট্রোকের সুচিকিৎসা রয়েছে এমন নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *