চলে গেলেন ‘প্রফেসর এক্স’ ও ‘ক্যাপ্টেন পিকার্ড’! হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের জীবনাবসান

হলিউড ও বিশ্ব বিনোদন জগতে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। ‘এক্স-মেন’ (X-Men) ও ‘স্টার ট্রেক’ (Star Trek) ফ্র্যাঞ্চাইজিতে দুর্দান্ত অভিনয়ের সুবাদে বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্তের হৃদয় জয় করা কিংবদন্তি অভিনেতা স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট আর নেই। বুধবার লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। বৃহস্পতিবার অভিনেতার অফিশিয়াল টিমের তরফে সোশাল মিডিয়ায় এক বিবৃতিতে এই দুঃসংবাদ অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়।

মর্মান্তিক রোগের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত লড়াই
পারিবারিক সূত্রে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, আলঝেইমার রোগ ও লিউই বডি ডিমেনশিয়ার মতো জটিল রোগের সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত অথচ মর্মস্পর্শী লড়াইয়ের পর তাঁর জীবনাবসান ঘটে। লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাড়িতে, তাঁর প্রিয় স্ত্রী সানির স্নেহপূর্ণ তত্ত্বাবধানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি পরিবার ও ঘনিষ্ট বন্ধুদের উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁর চারপাশে ছিল সরাসরি পরিবেশিত সঙ্গীত, প্রার্থনা, চোখের জল ও হাসি—যা কেবল তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্বেরই প্রাপ্য ছিল। প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের পরিবারে রেখে গেছেন তাঁর স্ত্রী সানি ওজেল এবং তাঁর প্রথম সংসারের দুই সন্তান—ছেলে ড্যানিয়েল স্টুয়ার্ট ও মেয়ে সোফি আলেকজান্দ্রা-স্টুয়ার্ট।

সহকর্মীদের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও আবেগঘন বার্তা
প্যাট্রিক স্টুয়ার্টের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাঁর সহকর্মী ও অনুরাগীদের মধ্যে। ‘স্টার ট্রেক’-এ তাঁর সহকর্মী ও প্রবীণ অভিনেতা উইলিয়াম শ্যাটনার গভীর শোক প্রকাশ করে লিখেছেন, “কী হৃদয়বিদারক একটি সপ্তাহ গেল! স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট ছিলেন একজন পরম বন্ধু, সহকর্মী এবং অসাধারণ একজন অভিনেতা।” শ্যাটনার আরও যোগ করেন যে, মঞ্চ থেকে শুরু করে ‘এন্টারপ্রাইজ’-এর ব্রিজ পর্যন্ত—তিনি যা কিছু করেছেন, তার সবটিতেই বুদ্ধিমত্তা, শালীনতা এবং গভীর মানবিক বোধের অনন্য ছাপ রেখে গেছেন। ক্যাপ্টেন পিকার্ড চরিত্রটি যেমন মানবতার সেরা গুণাবলীর প্রতিনিধিত্ব করত, বাস্তবে যিনি এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, তিনিও ছিলেন ঠিক তেমনই।

দারিদ্র্য থেকে হলিউডের শিখরে: এক বর্ণাঢ্য কেরিয়ার
ইংল্যান্ডে অত্যন্ত সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট পরবর্তীকালে শেক্সপিয়রীয় নাট্যমঞ্চে এক দক্ষ অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে অভিনয়জীবন শুরু করা স্টুয়ার্ট ১৯৬০-এর দশক থেকে ‘রয়্যাল শেক্সপিয়ার কোম্পানি’-র সদস্য হিসেবে মঞ্চে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। ২০০৭ সালে রুপার্ট গুল্ডের পরিচালনায় ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে তাঁর অসাধারণ অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয় এবং এর জন্য তিনি একটি টনি অ্যাওয়ার্ড মনোনয়ন পান। ২০০৯ সালে বিবিসি-র ‘হ্যামলেট’ নাটকে ডেভিড টেন্যান্টের সঙ্গেও তিনি স্ক্রিন শেয়ার করেন।

তবে ৪৭ বছর বয়সে টেলিভিশন সিরিজ ‘স্টার ট্রেক: দ্য নেক্সট জেনারেশন’ (১৯৮৭–১৯৯৪)-এ বিদগ্ধ ‘ক্যাপ্টেন জঁ-লুক পিকার্ড’ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার পরই তিনি মূলধারার বিশ্বজোড়া তারকাখ্যাতি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ‘এক্স-মেন’ সিনেমার সিরিজে টেলিপ্যাথিক ক্ষমতার অধিকারী ‘প্রফেসর এক্স’ (চার্লস জেভিয়ার) চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নতুন প্রজন্মের কাছেও আইকনিক হয়ে ওঠেন। নাট্যশিল্পে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছ থেকে মর্যাদাপূর্ণ ‘নাইট’ (Knight) উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি।

দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কেরিয়ারে তিনি একাধিক এমি (Emmy) এবং গোল্ডেন গ্লোব (Golden Globe) মনোনয়ন অর্জন করেছেন, এবং মর্যাদাপূর্ণ লরেন্স অলিভিয়ার অ্যাওয়ার্ড ও একটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জয় করেছেন। ১৯৯৬ সালে বিনোদন জগতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হলিউড ওয়াক অব ফেমে তাঁর নামে একটি স্টার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁর প্রয়াণে হলিউড হারাল এক যুগের অন্যতম সেরা দীপ্তিময় নক্ষত্রকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *