“পড়ানোই কাজ, রাজনীতি নয়!” নতুন শিক্ষক নিয়োগে কড়া নিয়ম বিজেপি সরকারের, ক্ষোভে ফুঁসছে শিক্ষক সংগঠন

শিক্ষকদের সক্রিয় রাজনীতিতে নো-এন্ট্রি! মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত রাজ্যের; তোলপাড় শিক্ষা অঙ্গন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শ্রেণীকক্ষে মনোযোগী করতেই এবার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল রাজ্যের বিজেপি সরকার। এখন থেকে নতুন নিযুক্ত কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকা আর প্রত্যক্ষ বা সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। বুধবার রাজ্য মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পরই সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়।

সরকারের এই চরম অবস্থান প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে যেমন মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তেমনই শিক্ষক সংগঠনের একাংশ এবং বিরোধী দলগুলি এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে। তবে সরকার যে এই পদক্ষেপে সম্পূর্ণ অনড়, তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

“ভারতে কোথাও শিক্ষকরা ভোটে লড়েন না!” কী জানালেন শুভেন্দু ও উচ্চশিক্ষামন্ত্রী?

রাজ্যের এই বড় পদক্ষেপ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতিমুক্ত করাই তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন:

“আমাদের সরকারের আমলে যত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ হবে, তাঁরা প্রত্যক্ষ রাজনীতি করতে পারবেন না, আমরা তার অনুমতি দেব না। ভারতের কোনো রাজ্যে শিক্ষকরা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন না। আজ থেকে যাঁরা নতুন নিয়োগ পাবেন, তাঁরা পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে লড়তে পারবেন না। তবে যাঁরা ইতিমধ্যে রাজনীতিতে যুক্ত আছেন বা সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁদের সেই অধিকার আমরা খর্ব করছি না।”

একই সুর শোনা গিয়েছে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী তথা বিজেপি বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও। তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “শিক্ষকদের মূল কাজ শিক্ষার্থীদের পড়ানো, রাজনীতি করা নয়। অতীত সরকারগুলির সময় যে ভুল হয়েছিল, তা আর চলতে দেওয়া হবে না। সমগ্র ভারতে শিক্ষকরা সরাসরি রাজনৈতিক পদে থাকেন না।”

সংবিধান ও দ্বিচারিতার প্রশ্ন তুলে বিরোধিতায় নামল শিক্ষক সংগঠন

সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই শিক্ষামহলে তীব্র প্রতিবাদ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল সরকারের এই নীতিকে ‘দ্বিচারিতা’ বলে তোপ দেগেছেন।

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন:

“অন্যান্য রাজ্যে শিক্ষকরা সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সরকারি কর্মচারী, তাই সেখানে এই নিয়ম প্রযোজ্য। সরকার যদি ক্যাবিনেট ও বিধানসভায় আইন পাস করে সমস্ত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের সরাসরি সরকারি কর্মচারী হিসেবে ঘোষণা করে, তবেই এ নিয়ম মেনে নেওয়া সম্ভব। পুরনোদের এক নিয়ম আর নতুনদের জন্য আলাদা নিয়ম— এই ধরনের দ্বিচারিতা আমাদের সংবিধান সমর্থন করে না।”

শিক্ষক সংগঠনের পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরীসহ একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দল।

দীর্ঘদিনের বিতর্কে কি তবে দাঁড়ি পড়ল?

শিক্ষকরা ক্লাস বাদ দিয়ে কেন দলীয় রাজনীতিতে সময় দেবেন? কিংবা সরকারি বেতন পেয়ে কীভাবে নির্বাচনে প্রার্থী হবেন? —এই প্রশ্নগুলি নিয়ে বঙ্গ রাজনীতিতে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। একদিকে যখন শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করার এই উদ্যোগকে সাধারণ অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের একাংশ স্বাগত জানাচ্ছেন, অন্যদিকে শিক্ষক অধিকার খর্বের অভিযোগে আদালতের আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারিও ভেসে আসছে। সব মিলিয়ে সরকারের এই নয়া ফরমান রাজ্য রাজনীতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *