‘রাজনৈতিক হিংসা থেকে বাঁচান পড়ুয়াদের!’ সাম্প্রদায়িক মানসিকতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন অমর্ত্য সেন

শিক্ষাঙ্গনে হামলা ও রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে চরম উদ্বেগ অমর্ত্য সেনের; তীব্র নিন্দা করলেন ‘সাম্প্রদায়িক মানসিকতা’র

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লাগাতার হামলা এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক হিংসার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের ও নিবিড় সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাঙ্গনে একটি সম্পূর্ণ হিংসামুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষ ও পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য। একইসঙ্গে ক্যাম্পাসে এ ধরনের অশান্তির নেপথ্যে থাকা ‘সাম্প্রদায়িক মানসিকতা’রও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তীব্র নিন্দা করেছেন তিনি।

যাদবপুর ও এসআরএফটিআই-এর অশান্তি নিয়ে বার্তা

সম্প্রতি সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI)-এর ক্যাম্পাসে চলা অশান্তি এবং তার জেরে পড়ুয়াদের আন্দোলন ও সংহতি জানাতে বৃহস্পতিবার একটি বিশেষ সাংবাদিক বৈঠক করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী সংসদ। সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক তথা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর লিখিত ইমেল বার্তার মাধ্যমে নিজের মতামত তুলে ধরেন।

বার্তায় তিনি জানান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর হামলার ঘটনার কথা জানতে পেরে তিনি রীতিমতো হতবাক হয়েছেন। তাঁর কথায়, সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক হিংসার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা আজকের দিনে আগের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশের সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পঠনপাঠনরত ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানোও অত্যন্ত জরুরি।

৭০ বছরের পুরনো স্মৃতির টান ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

প্রায় ৭০ বছর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নিজের অধ্যাপনাজীবন শুরু করেছিলেন অমর্ত্য সেন। সেই সুবাদে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর আত্মিক যোগ রয়েছে। আজকের বার্তায় সেই কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, কেবল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভীতিহীন ও হিংসামুক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকার এবং পড়াশোনা করার অধিকার সকলের রয়েছে। শিক্ষাঙ্গনের অভ্যন্তরে যে কোনো ধরনের হিংসাত্মক কার্যকলাপের পিছনে যদি কোনো সাম্প্রদায়িক ভাবনা কাজ করে, তবে তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এসআরএফটিআই-এর চলমান আন্দোলন ও প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, গত ২৭ সেপ্টেম্বর এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসে একটি দক্ষিণপন্থী সংগঠনকে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে গোলমালের সূত্রপাত হয়। ক্যাম্পাসের ভিতরের প্রেক্ষাগৃহে ওই অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে সাধারণ পড়ুয়ারা বহিরাগতদের হামলার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ। এরপর গত ৪ অক্টোবরও ফের ক্যাম্পাসে হামলার ঘটনা ঘটে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে পড়ুয়াদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সংঘাত চরমে পৌঁছায়।

  • উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি: পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার অভিযোগে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হন আন্দোলনকারীরা।

  • বহিষ্কার ও আন্দোলন: উপাচার্যকে হেনস্তা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগে ৬ জন ছাত্রছাত্রীকে বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে প্রায় এক মাস ধরে একটানা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পড়ুয়ারা।

  • দেশজুড়ে সমর্থন: গত ২৭ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানানো হয়। যার জেরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI)-এর মতো নামী প্রতিষ্ঠানগুলি সংহতি জানায়। অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

এর আগে গত অগস্টে যাদবপুরেও বহিরাগতদের প্রবেশ ও তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছিল। পরপর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিংসা ও উত্তেজনার আবহে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের এই কড়া বার্তা শিক্ষাঙ্গনের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও রাজনীতিকরণের প্রশ্নকে নতুন করে দেশের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *