ভারতের ব্লুচিপ শেয়ার থেকে ১ লাখ কোটি গায়েব! ৫৩টি মেগা কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক বিক্রি!

ভারতীয় শেয়ার বাজারের স্তম্ভ এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে পরিচিত মেগা কোম্পানিগুলি (Bluechip Stocks) থেকে রেকর্ড হারে মূলধন তুলে নিচ্ছে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (FII)। ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তথ্য অনুসারে, ১ লাখ কোটি টাকা বা তার বেশি মার্কেট ক্যাপ থাকা ভারতের অন্তত ৫৩টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিতে নিজেদের শেয়ারের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে বিদেশিরা। টানা এই বিক্রির ধাক্কায় দালাল স্ট্রিটে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— ভারতের মেগা কোম্পানিগুলির বৃদ্ধির ইঞ্জিন কি তবে এবার সত্যি ধীরগতির হয়ে পড়েছে?

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের টাকা তুলে নেওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় জায়ান্ট কোম্পানিগুলির ওপর। ভারতের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক HDFC Bank-এ বিদেশি শেয়ার ২.৪৩ শতাংশ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে এবং চলতি বছর এ পর্যন্ত ব্যাংকের শেয়ার দর প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, বাজার মূলধনের নিরিখে দেশের এক নম্বর সংস্থা Reliance Industries-এ বিদেশি অংশীদারিত্ব ০.৫২ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে, যার জেরে রিলায়েন্সের শেয়ার চলতি বছর ২৪.২ শতাংশ পড়েছে।

এছাড়া পিএফসি (২.৭১ percentage point), অ্যাক্সিস ব্যাংক (১.৮৬ percentage point), কামিন্স ইন্ডিয়া (১.৭২ percentage point), মহিন্দ্রা অ্যান্ড মহিন্দ্রা (১.৫৫ percentage point), বেদান্ত অ্যালুমিনিয়াম (১.৫২ percentage point) এবং আইটিসি (১.০১ percentage point)-এর মতো শেয়ার থেকেও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মূলধন গুটিয়ে নিয়েছে। টিসিএস, ভারতী এয়ারটেল, মারুতি সুজুকি, হিন্দুস্থান ইউণিলিভার এবং এইচডিএফসি লাইফের মতো শেয়ারগুলিতেও বিদেশি বিক্রেতাদের চাপ স্পষ্ট দেখা গেছে।

যে ৫৩টি কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অংশীদারিত্ব কমিয়েছে:

ক্রমিক কোম্পানির নাম (Stock) FII অংশীদারিত্ব হ্রাস (Percentage Point)
১ Paytm ৪.৫৭
২ PFC ২.৭১
৩ HDFC Bank ২.৪৩
৪ Axis Bank ১.৮৬
৫ Cummins India ১.৭২
৬ M&M ১.৫৫
৭ Vedanta Aluminium ১.৫২
৮ Eicher ১.৫০
৯ Varun Beverages ১.৫০
১০ Indus Towers ১.৪৯
১১ Hindalco ১.২৪
১২ Tata Steel ১.১৮
১৩ Bharti Airtel ১.০৪
১৪ BEL ১.০৩
১৫ ITC ১.০১
১৬ Polycab India ০.৯৪
১৭ CG Power ০.৮৯
১৮ DLF ০.৮৮
১৯ Coal India ০.৭৮
২০ DMart ০.৭৪
২১ Adani Power ০.৭৩
২২ Jio Financial ০.৬২
২৩ Adani Energy ০.৫৭
২৪ Kotak Bank ০.৫৬
২৫ LG India ০.৫৩
২৬ Reliance ০.৫২
২৭ HDFC Life ০.৫২
২৮ NTPC ০.৫১
২৯ Adani Green ০.৫১
৩০ Hitachi Energy ০.৪৮
৩১ IOCL ০.৪৭
৩২ Britannia Industries ০.৪৬
৩৩ IndiGo ০.৪২
৩৪ Bajaj Finance ০.৪২
৩৫ Canara Bank ০.৪১
৩৬ Maruti Suzuki ০.৪০
৩৭ Dr Reddy’s ০.৩৬
৩৮ Vi ০.৩৪
৩৯ Power Grid ০.৩০
৪০ SBI Life ০.২৭
৪১ Solar Industries India ০.২৬
৪২ HUL ০.২৪
৪৩ BPCL ০.১৮
৪৪ Sun Pharma ০.১৮
৪৫ UltraTech ০.১৬
৪৬ LTM ০.১৬
৪৭ Bajaj Auto ০.১৩
৪৮ Grasim Industries ০.১৩
৪৯ Tata Capital ০.১১
৫০ ABB India ০.১০
৫১ Jindal Steel ০.০৯
৫২ Hyundai ০.০৯
৫৩ TCS ০.০৬

কেবল ‘ক্যাশ ফ্লো মেশিন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় কোম্পানিগুলি?

শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শেয়ার বিক্রির প্রবণতা সাময়িক মূলধন সরিয়ে নেওয়া নয়। স্যামকো সিকিউরিটিজের সিইও জিমিত মোদির মতে, শেয়ার বাজার সবসময় ভবিষ্যতের হিসাব কষে। কিন্তু নিফটির বর্তমান মেগা কোম্পানিগুলির ভবিষ্যত উদ্ভাবনের দৌড়ে কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছে। তিনি জানান, প্রযুক্তি ও নতুন থিম থেকেই আগামী দিনের সম্পদ তৈরি হবে, অথচ বর্তমান লার্জ-ক্যাপ কোম্পানিগুলিতে সেই উদ্ভাবন নগণ্য। এই মেগা কোম্পানিগুলি এখন কেবল ‘ক্যাশ ফ্লো’ তৈরি করার যন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে নতুন কোনো গ্রোথ ইঞ্জিন বেঁচে নেই। অন্যদিকে, অ্যাভেন্ডাস ওয়েলথ-এর মতে, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল, সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি ও সোলারের মতো নতুন ক্ষেত্রে বিশ্বমানের ভারতীয় মেগা কোম্পানি এখনও তৈরি হওয়া বাকি।

বিক্রি সত্ত্বেও যে সব শেয়ার দিয়েছে বাম্পার রিটার্ন

চমকপ্রদ বিষয় হলো, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অংশীদারিত্ব কমালেও কিছু শেয়ার বিনিয়োগকারীদের পকেট ভরিয়েছে। পেটিএম-এর মূল সংস্থা One97 Communications-এ বিদেশি অংশীদারিত্ব সবচেয়ে বেশি ৪.৫৭ শতাংশ পয়েন্ট কমলেও, চলতি বছর শেয়ারটি ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আদানি পাওয়ার ও সান ফার্মা বিদেশি বিক্রির চাপ সামলেও পজিটিভ রিটার্ন দিয়েছে। অন্যদিকে স্টারলাইট টেকনোলজিসে প্রায় ৭০০ শতাংশ রিটার্ন মেলার পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজেদের ১.৯৫ শতাংশ পয়েন্ট শেয়ার বিক্রি করে প্রফিট বুকিং করেছে।

সস্তা ভ্যালুয়েশনে কি ফের ফিরবে লক্ষ্মী?

টানা দরপতনের ফলে বড় কোম্পানিগুলির শেয়ার দর এখন অনেকটাই আকর্ষণীয় বা সস্তা হয়েছে। ইকুইরাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিআইও আশুতোষ তিওয়ারির মতে, লার্জ-ক্যাপ শেয়ারের মূল্যায়ন বা ভ্যালুয়েশন কমে যাওয়ায় এখন সেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি কম এবং মুনাফার সুযোগ বেশি। মোতিলাল ওসওয়ালের রিপোর্ট জানাচ্ছে, লার্জ-ক্যাপ শেয়ারের ভ্যালুয়েশন তাদের ঐতিহাসিক গড় থেকে ১৮ শতাংশ নিচে নেমে এসেছে। ২০২৬ থেকে ২০২৮ অর্থবর্ষের মধ্যে ভারতীয় কোম্পানিগুলির আয় গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে ধারণা তাদের।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মন্দা, ব্যাঙ্কিংয়ে আশার আলো

এইচএসবিসি (HSBC)-র মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর প্রভাবে তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতের আয় বৃদ্ধি ৪-৫ শতাংশ থেকে কমে ২-৩ শতাংশে নেমেছে, যা ২০২৭ অর্থবর্ষে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করতে পারে। তবে প্রাইভেট ব্যাংক ও ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর তাদের পাঁচ বছরের গড় থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ সস্তায় কেনাবেচা হচ্ছে। এসএমই এবং রিটেল ঋণের চহিদা মজবুত থাকায় আগামী দিনে এই মেগা ও লার্জ-ক্যাপ শেয়ারগুলি ফের বাজারে বড়সড় ধাক্কা দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *