৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার আলটিমেটাম! আইটি দুনিয়ায় আছড়ে পড়ল কোন মেগা দুর্যোগ?

বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফের বড় ধরনের কম্পন। চার দেশের হাজার হাজার কর্মীর সামনে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব অর্থাৎ ‘ভলানটারি বাইআউট’ তুলে দিল টেক-দৈত্য মাইক্রোসফট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর পেছনে হুহু করে মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায়, অন্যান্য পরিচালন খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতেই মূলত এই চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশেষ বাইআউট কর্মসূচির আওতায় পড়তে চলেছেন বিশ্বের প্রায় ৬০ হাজার কর্মী, যা গোটা মাইক্রোসফটের মোট কর্মীসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের-ও বেশি।

কারা পড়ছেন এই বাইআউটের আওতায়?
সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং কানাডায় কর্মরত যোগ্য কর্মীরাই এই অফারের আওতায় আসবেন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলির নির্ধারিত কিছু নির্দিষ্ট বিভাগে ৭০তম গ্রেড বা তার নীচের পর্যায়ের কর্মীদের কাছে এই প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। ঘোষণার পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যোগ্য কর্মীদের ইমেইলে সমস্ত ডিটেইলস পৌঁছে যাচ্ছে বলে খবর। এই মেগা অফার গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক ও ক্যারিয়ার প্যাকেজ সঙ্গে নিয়ে নিজেদের ইচ্ছায় পদত্যাগ করতে পারবেন।

মাইক্রোসফটের ভেতরের এক সূত্রের দাবি, এই ভলানটারি বাইআউটের প্রভাবে সরাসরি প্রভাবিত হবেন কোপাইলট (Copilot), এআই এক্সপেরিয়েন্সেস, অর্থ বিভাগ, মানবসম্পদ (HR) বিভাগ, এক্সবক্স এবং উইন্ডোজ প্লাস ডিভাইস-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টিমগুলির কর্মীরা। তবে আপাতত এই প্রস্তাবের কোপ থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে মার্কেটিং, বাণিজ্যিক ব্যবসা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিভাগে কর্মরত কর্মীদের।

হঠাৎ কেন এত বড় সিদ্ধান্ত?
বর্তমানে মাইক্রোসফট সহ টেক দুনিয়ার তাবড় সংস্থাগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিকাঠামো অর্থাৎ সুবিশাল ডেটা সেন্টার ও উন্নত এআই চিপ তৈরির পেছনে শত শত বিলিয়ন ডলার ঢালছে। ২০২৬ ক্যালেন্ডার বছরের জন্য মাইক্রোসফট একাই ১৭৫ বিলিয়ন ডলারের ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচারের (Capex) পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে এআই খাতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালার পরও বাজার থেকে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন আসবে কি না, তা নিয়ে শেয়ারবাজারের বড় বড় বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন উঠছে। সে কারণেই অতিরিক্ত খরচ ছেঁটে ফেলে ব্যালেন্স শিট নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে সংস্থা।

মাইক্রোসফটের চিফ পিপল অফিসার অ্যামি কোলম্যান কর্মীদের উদ্দেশ্যে পাঠানো বার্তায় এই কর্মসূচির যৌক্তিকতা নিয়ে স্পষ্ট জানান, “যাঁরা সংস্থার বাইরে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের জন্য এই প্রস্তাবটি একটি নতুন সুযোগ তৈরি করবে। কর্মীরা প্রয়োজনীয় কর্পোরেট সাপোর্ট নিয়েই সম্মানজনকভাবে বিদায় নিতে পারবেন। পাশাপাশি সংস্থাগুলোও বদলে যাওয়া চাহিদার সঙ্গে নিজেদের কর্মীকাঠামো নতুন করে সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।”

উল্লেখ্য, গত ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত মিলিয়ে মাইক্রোসফটে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার পূর্ণকালীন কর্মী কর্মরত রয়েছেন।

চলতি বছরেই একাধিকবার কর্মিসঙ্কোচন
স্বেচ্ছায় পদত্যাগের এই প্রকল্প নতুন কিছু নয়। এর আগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯ হাজার কর্মী (সারা দেশের কর্মীর প্রায় ৭ শতাংশ) এই ভলানটারি বাইআউটের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

এখানেই শেষ নয়, গত জুলাই মাসেও বিশ্বজুড়ে নিজেদের গেমিং ও এক্সবক্স (Xbox) ব্যবসার বড়সড় পুনর্গঠনের নাম করে প্রায় ৪ হাজার ৮০০টি পদ একঝটকায় বিলুপ্ত করে দিয়েছিল মাইক্রোসফট, যা ছিল সংস্থার মোট কর্মীসংখ্যার ২.১ শতাংশ। টানা কয়েক বছর বিশাল মূলধন ঢালার পর গেমিং থেকে দ্রুত লাভ তুলে আনতেই এই ছাঁটাই করা হয়েছিল।

আয়ের রিপোর্ট ও শেয়ার বাজারের অবস্থা
চলতি বছর জুড়ে মাইক্রোসফটের শেয়ারের দর ইতিমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে রয়েছে। আর সোমবার রয়টার্স ও ‘বিজনেস ইনসাইডার’-এ এই নতুন বাইআউট কর্মসূচির খবর প্রকাশ পেতেই শেয়ারের দাম আরও ১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বুধবার বাজার বন্ধ হওয়ার পর প্রথম ত্রৈমাসিকের ফলাফল প্রকাশ করতে চলেছে সংস্থা। তার ঠিক আগেই ৬০ হাজার কর্মীর সামনে চাকরি ছাড়ার এই বিকল্প প্রস্তাব পুরো টেক দুনিয়ায় ব্যাপক হইচই ফেলে দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *