মণ্ডপের ব্লু-প্রিন্ট বদলাতে চাপ ছিল? চোরবাগান ট্র্যাজেডিতে নড়েচড়ে বসল পুলিশ

উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজো মণ্ডপে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার তদন্তে এবার লালবাজারের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেল। গত সপ্তমীর সন্ধ্যায় পুজো মণ্ডপে প্রচণ্ড ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জন দর্শনার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। মহোৎসবের আনন্দ এক লহমায় পর্যবসিত হয় গভীর বিষাদে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে এবং মূল দায় নির্ধারণে পুজো মণ্ডপের প্রধান প্রতিমা ও প্যান্ডেল শিল্পী সুশান্ত শিবানী পালকে আগামী বুধবারের মধ্যে কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারে হাজির হওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে, ঘটনার দিন অর্থাৎ সপ্তমী রাতে চোরবাগান মণ্ডপের প্রধান প্রবেশ ও প্রস্থান পথের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করেছেন তদন্তকারীরা। লালবাজার সূত্রে খবর, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওই পুজো মণ্ডপের দায়িত্বে থাকা সমস্ত দায়িত্বরত পুলিশকর্মীদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে। মূলত সপ্তমী রাতে অনিয়ন্ত্রিত দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে কী ধরনের পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় কোনো বড় ধরনের প্রশাসনিক গাফিলতি বা চরম বিশৃঙ্খলা ছিল কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে চাইছেন গোয়েন্দারা।

কলকাতা পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চোরবাগানের এই অভূতপূর্ব মর্মান্তিক ঘটনার তদন্তে সংশ্লিষ্ট প্যান্ডেল প্রস্তুতকারক শিল্পীর আনুষ্ঠানিক বয়ান নথিভুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেই কারণেই তাঁকে ডেকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানার জন্য শিল্পী সুশান্ত শিবানী পালের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ সূত্রের খবর, লালবাজারে হাজির হলে শিল্পীর কাছে একগুচ্ছ জরুরি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া হবে। তদন্তকারীরা মূলত খতিয়ে দেখবেন—পুজো শুরুর আগে লালবাজারে চোরবাগান মণ্ডপের যে মূল ব্লু-প্রিন্ট বা নকশা জমা দেওয়া হয়েছিল, মণ্ডপটি কি হুবহু সেই নির্দেশিকা মেনে তৈরি হয়েছিল? পাশাপাশি, কাজের মাঝপথে মণ্ডপ নির্মাণে কোনো বড়সড় কাঠামোগত পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না এবং প্যান্ডেলের পরিকল্পনা পরিবর্তন করার জন্য বাইরে থেকে কেউ শিল্পীর ওপর কোনো প্রভাব বা চাপ সৃষ্টি করেছিল কি না, তাও জানা হবে।

অন্যদিকে, ঘটনার তদন্তের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংগ্রহ করেছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের জমা দেওয়া প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে এক মারাত্মক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই সম্পূর্ণ বদ্ধ মণ্ডপের ভিতরে মোট ১৩৪ টনের এয়ার কন্ডিশনিং (AC) মেশিন বসানো হয়েছিল। কিন্তু মণ্ডপের ভৌগোলিক আয়তন এবং সেখানে প্রবেশ করা হাজার হাজার দর্শনার্থীর বিশাল সংখ্যার তুলনায় এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একেবারেই অপর্যাপ্ত ছিল।

বর্তমানে লালবাজারের তদন্তকারী দল মূলত দুটি দিক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছে—এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা কি শুধুই প্রতিকূল আবহাওয়া ও অনিয়ন্ত্রিত অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ঘটেছে, নাকি মণ্ডপের নকশাগত ত্রুটি ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাবের ফলে সৃষ্ট চরম কৃত্রিম অক্সিজেন সংকটই এই বিপর্যয়ের কারণ? শিল্পীর বয়ান রেকর্ড করার পর ফরেনসিক রিপোর্ট ও অন্যান্য প্রমাণের মেলবন্ধন ঘটিয়ে পুলিশ মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করতে প্রস্তুত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *