মহাসপ্তমীর রাতে চোরবাগানে কেন নেমে এল নরকীয় যন্ত্রণা? এই ১০ ভুলের মাশুল দিতে হলো ১৯টি তাজা প্রাণকে?

বাঙালির শ্রেষ্ঠ শারদ উৎসবের আনন্দ মুহূর্তে বিষাদে বদলে গেল মহাসপ্তমীর রাতে। কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীন পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনায় গোটা রাজ্য তথা দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অতীতে বহুবার দুর্গাপুজোয় উপচে পড়া ভিড় দেখেছে তিলোত্তমা, কিন্তু এমন ভয়াবহ বিপর্যয় এর আগে দেখেনি কলকাতা। ঠিক কী কারণে এই মহাবিপর্যয় ঘটেছিল, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মণ্ডপের প্যান্ডেলের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে মূলত ১০টি সম্ভাব্য কারণ সামনে উঠে এসেছে:

১. আচমকা মুষলধারে বৃষ্টি

মহাসপ্তমীর ব্যস্ততম সময়ে যখন মণ্ডপমুখী মানুষের ঢল নেমেছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ তীব্র বৃষ্টি শুরু হয়। পর্যাপ্ত ছাতা বা রেইনকোট না থাকায় দর্শনার্থীরা ভিজে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন, যা বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত ঘটায়।

২. মণ্ডপের ভেতরে একযোগে আশ্রয়ের চেষ্টা

বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বা রাস্তায় থাকা শত শত দর্শনার্থী একসাথে হুড়মুড় করে মণ্ডপের ভেতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেন। এর ফলে প্যান্ডেলের ভেতরে মুহূর্তের মধ্যে অসম্ভব চাপ তৈরি হয়।

৩. অপরিসর ও সংকীর্ণ মণ্ডপ চত্বর

প্রাথমিক তদন্তে জানা যাচ্ছে, চোরবাগান পুজো মণ্ডপটি তুলনামূলকভাবে বেশ অপরিসর একটি এলাকায় তৈরি হয়েছিল। বিপুল পরিমাণ মানুষের চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত প্রশস্ততা বা বিকল্প প্রস্থান পথ সেখানে ছিল না।

৪. প্রবেশ ও প্রস্থান পথ এক থাকা

মণ্ডপে ঢোকা এবং বেরোনোর রাস্তা আলাদা না করে মূলত একই পথ ব্যবহার করা হচ্ছিল। ফলে একদিকে যেমন নতুন ভিড় ভেতরে ঢুকছিল, অন্যদিকে বেরোতে গিয়ে সাধারণ মানুষ একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন।

৫. দড়ি দিয়ে অস্থায়ী বিভাজন ও তা খুলে যাওয়া

ভিড় সামলাতে যে দড়ি দিয়ে পথ ভাগ করা হয়েছিল, বৃষ্টি নামতেই ভিজে যাওয়ার ভয়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণ বা সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা সেই দড়ি ফেলে সরে যান বা পালিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলেই মানুষের হুড়োহুড়ি আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

৬. অপর্যাপ্ত ও অপ্রশিক্ষিত ভিড় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

বিশাল জনজোয়ার সামলানোর মতো যে পোক্ত ও পেশাদার নিরাপত্তা বা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থাকা প্রয়োজন ছিল, ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অস্থায়ী কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

৭. ভিআইপি পাস ও সাধারণ দর্শনার্থীর দ্বন্দ্ব

ভিআইপি এন্ট্রি এবং সাধারণ মানুষের লাইন একই জায়গায় মিশে যাওয়ার কারণে ভিড় অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। ভিআইপি পাসধারীদের দ্রুত ঢোকাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের সারিতে মারাত্মক ধাক্কা লাগে।

৮. বেসরকারি নিরাপত্তা ও হোমগার্ডদের গাফিলতি

অভিযোগ রয়েছে, বৃষ্টি নামতেই পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভিড় সামলানোর দায়িত্বে থাকা হোমগার্ড ও বেসরকারি সিকিউরিটি কর্মীরা নিজেদের বাঁচাতে দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে যান, যার ফলে সম্পূর্ণ প্যান্ডেল চত্বর অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে।

৯. অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে হুড়োহুড়ি (Stampede)

হাজার হাজার মানুষের সম্মিলিত চাপে যখন সামনের সারির মানুষ মাটিতে পড়ে যান, তখন পেছনের উন্মত্ত জনস্রোত তা খেয়াল না করেই এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই পদপিষ্ট হওয়ার ফলেই একের পর এক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

১০. প্রশাসনের নজরদারির অভাব ও দেরিতে প্রতিক্রিয়া

বৃহৎ পুজোগুলির ক্ষেত্রে যে কড়া প্রশাসনিক নজরদারি এবং আপৎকালীন উদ্ধারকারী দলের তৎপরতা আগে থেকে থাকা উচিত ছিল, তাতে কিছুটা ঘাটতি ছিল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি আন্দাজ করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও বিলম্ব হয়েছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *