কাজের তুমুল চাপ আর মানসিক উদ্বেগে ভুগছেন? অজান্তেই কিন্তু মস্তিষ্কে নেমে আসছে ঘাতক স্ট্রোকের বিপদ!

আধুনিক ইঁদুরদৌড়ের যুগে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই অতিরিক্ত মানসিক উদ্বেগ বা দীর্ঘদিনের ক্লান্তি কেবল মনকেই অস্থির করে না, বরং আপনার মস্তিষ্কে নিঃশব্দে ডেকে আনতে পারে ঘাতক ব্রেন স্ট্রোক। সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত স্ট্রেস সরাসরি ব্রেন স্ট্রোক এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।

স্ট্রেস কীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে?
মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে বা রক্তনালী ফেটে গেলে স্ট্রোক ঘটে। আমরা যখন অতিরিক্ত উদ্বেগে থাকি, তখন শরীরে ‘অ্যাড্রেনালিন’ ও ‘কর্টিসল’ হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এর ফলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু স্ট্রেস যদি দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক রূপ নেয়, তবে রক্তনালীতে স্থায়ী প্রদাহ (Inflammation) সৃষ্টি হয় এবং রক্তচাপ সবসময় উচ্চমাত্রায় থাকে। উচ্চ রক্তচাপই হলো ব্রেন স্ট্রোকের প্রধান অনুঘটক। এছাড়া ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধা বা ‘এথেরোস্ক্লেরোসিস’-এর ঝুঁকিও অনেক বাড়িয়ে দেয় এই অতিরিক্ত মানসিক চাপ।

স্ট্রেসের পরোক্ষ প্রভাব আরও প্রাণঘাতী!
দীর্ঘদিন ধরে কাজের চাপ, আর্থিক টানাটানি কিংবা মানসিক সমস্যায় ভুগতে থাকা মানুষরা অনিদ্রা, শারীরিক চর্চার অভাব, ধূমপান বা মদ্যপানের মাত্রা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝুঁক পড়ে।

ঘুমের অভাব: মানসিক চাপের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। আর পর্যাপ্ত ঘুম না হলে রক্তে শর্করার মাত্রা ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন: অতিরিক্ত স্ট্রেস মানুষকে স্থূলতা (Obesity), ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরলের দিকে ঠেলে দেয়, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন?
যাঁরা আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা বা হৃদরোগে ভুগছেন অথবা যাঁদের আগে একবার স্ট্রোক বা টিআইএ (Mini Stroke) হয়েছে, তাঁদের জন্য অতিরিক্ত স্ট্রেস অত্যন্ত মারাত্মক প্রমাণিত হতে পারে।

রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?
চিকিৎসকদের মতে, কেবল স্ট্রেস দূর করলেই স্ট্রোক ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনে।
১. নিয়মিত যোগব্যায়াম ও ধ্যান: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি, যোগব্যাস বা মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে দারুণ কাজ করে।
২. পর্যাপ্ত ঘুম: রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
৩. নিয়মিত পরীক্ষা: রক্তচাপ, ব্লাড সুগার এবং কোলেস্টেরল নিয়মিত পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
৪. কাজ ও জীবনের ভারসাম্য: কাজের অতিরিক্ত চাপ এড়িয়ে নিজের জন্য এবং পরিবারের জন্য সময় বের করা জরুরি।

মূল কথা: মানসিক চাপ সরাসরি একা স্ট্রোক ঘটায় না, তবে এটি এমন একটি ক্ষতিকর জৈবিক ও আচরণগত পরিবেশ তৈরি করে যা ব্রেন স্ট্রোকের সম্ভাবনা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই উচ্চ রক্তচাপ বা সুগার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিজের মনের যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *