ফ্রান্সে যাওয়ার অনুমতি মিলল ভগवंत মানের! কেন্দ্রকে বিরাট ধাক্কা দিয়ে হাইকোর্টে বড় জয় পঞ্জাব সরকারের

কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফ্রান্স সফরের আইনি ও প্রশাসনিক ছাড়পত্র পেলেন পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগवंत মান এবং তাঁর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। পঞ্জাব এবং হরিয়ানা হাইকোর্টের একটি যুগান্তকারী রায়ের ফলে তাঁদের বহুল প্রতীক্ষিত ফ্রান্স সফরের সমস্ত জট কেটে গেছে। এর আগে পঞ্জাব সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়েছিল। রাজ্য সরকারের অভিযোগ ছিল যে, মুখ্যমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিদেশ যাত্রার সমস্ত প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও আইনি প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা সত্ত্বেও কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তা আটকে দেওয়া হয়েছিল। বিদেশ মন্ত্রকের অফিসিয়াল অনলাইন পোর্টালের পাতায় কোনো ধরনের যৌক্তিক কারণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই স্রেফ ‘অস্বীকৃত’ বা ‘ডিনাইড’ সিলমোহর সেঁটে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আবেদনের আবেদনপত্র বাতিল করার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ দর্শানো তো দূরে থাক, উল্টে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকে তাদের উপযুক্ত আইনি ও প্রশাসনিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার ন্যূনতম সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।

আদালতের শুনানির সময় পঞ্জাব সরকারের প্রধান আইনজীবী বেঞ্চের সামনে অত্যন্ত জোরালো সওয়াল করে জানান যে, প্রতিবেশী রাজ্য হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত অবাধে গত এক মাসের ব্যবধানে প্রথমে সিঙ্গাপুর এবং বর্তমানে সুইডেন সফরে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অথচ যে সমস্ত রাজ্যগুলিতে বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সরকার প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, সেই সমস্ত রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের ঠিক কী কারণে বিদেশ যাত্রার অনুমতি দেওয়া হয় না, তা এক বিরাট রহস্য। কখনো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ভুয়ো জুজু দেখিয়ে, আবার কখনো রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের অসদুদ্দেশ্যেই দেশের বিভিন্ন অ-বিজেপিশাসিত রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত বিদেশ সফর বারবার আটকে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে আদালতে তীব্র আপত্তি জানিয়ে যুক্তি পেশ করা হয়েছিল যে, পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগवंत মানের ওপর নাকি অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা বা ‘সিকিউরিটি থ্রেট’ রয়েছে। কেন্দ্রের আরও দাবি ছিল যে, মুখ্যমন্ত্রী যে আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ফ্রান্সে যাচ্ছেন, সেই অনুষ্ঠান বা এক্সপোতে অংশ নেওয়ার জন্য পঞ্জাব সরকারের কাছে নাকি কোনো যথাযথ দাপ্তরিক আমন্ত্রণপত্রই ছিল না।

কেন্দ্রের এই সমস্ত দুর্বল ও খামখেয়ালি যুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে পঞ্জাব সরকারের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ফৌরি সৌফত আদালতে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে জানান যে, যে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিতে মুখ্যমন্ত্রী পঞ্জাব প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা সম্পূর্ণভাবে কৃষি এবং কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের সংবিধান অনুযায়ী কৃষি সম্পূর্ণরূপে একটি ‘রাজ্য তালিকাভুক্ত’ বা স্টেট সাবজেক্ট হওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় সরকার এক্ষেত্রে কোনো একতরফা অনধিকার চর্চা করতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, খোদ ভারতের সরকারি সংস্থার মাধ্যমেই পঞ্জাব সরকারকে এই আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত কেন্দ্রের অভিযোগের উপযুক্ত জবাব দিতে গিয়ে পঞ্জাবের আইনি প্রতিনিধি দল স্পষ্ট ভাষায় আদালতকে জানিয়ে দেয় যে, খোদ বিদেশ মন্ত্রকই বিগত দিনে স্বীকার করেছিল যে মুখ্যমন্ত্রী ভগवंत মান এবং অন্যান্য একাধিক রাজ্যের ভিআইপি মুখ্যমন্ত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল রয়েছে। তাছাড়া ঘটনা ঘটার ঠিক তিন সপ্তাহ আগেই ফরাসি দূতাবাসকে মুখ্যমন্ত্রীর ফ্রান্স সফর এবং তাঁর নিখুঁত নিরাপত্তা বিন্যাসের ব্যাপারে সরকারিভাবে সমস্ত কিছু লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে যাত্রার ঠিক অন্তিম মুহূর্তে এসে কোনো কারণ না দর্শিয়ে এভাবে হঠাৎ করে অনুমতি বাতিল করার একতরফা একরোখা সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি ও অযৌক্তিক।

পঞ্জাবের মার্কফেইড (Markfed) সংস্থাকে প্যারিসে আয়োজিত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক খাদ্য বাণিজ্য মেলা ‘এসআইএল প্যারিস-২০২৬’ (SIAL Paris 2026)-এর বিশ্বমঞ্চে প্যাভিলিয়ন স্টল বরাদ্দ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থা ‘এপডা’ (APEDA)-র ইন্ডিয়া প্যাভিলিয়নের ভেতরেই এই গুরুত্বপূর্ণ স্টলটি অবস্থান করছে। পঞ্জাব সরকারের দাখিল করা মূল মামলা অনুযায়ী, গত ৩ এবং ৮ সেপ্টেম্বর বিদেশ মন্ত্রকের কাছে সমস্ত প্রশাসনিক রাজনৈতিক অনুমতির জন্য যথাসময়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ৯ সেপ্টেম্বর অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সমস্ত প্রামাণ্য নথিপত্র সহ আবেদন জমা করা হয়। নির্ধারিত সফরের প্রায় পাঁচ সপ্তাহ আগেই সমস্ত স্তরের আইনি ক্লিয়ারেন্সের কাজ সুসম্পন্ন করা হয়েছিল। ফ্রান্সের ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে দীর্ঘ উচ্চপর্যায়ের আলোচনা পর্ব সেরে প্রশাসনিক কডার ক্লিয়ারেন্সের সমস্ত খুঁটিনাটি নিয়ম মেনেই সম্পন্ন করা হলেও চক্রান্তমূলকভাবে বিদেশ মন্ত্রকের পোর্টালের পাতায় আবেদন খারিজ দেখায়। সমস্ত পক্ষের আইনজীবীদের সুদীর্ঘ ও যুক্তিগ্রাহ্য সওয়াল-জবাব শোনার পর পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট কেন্দ্র সরকারের সমস্ত আপত্তি খারিজ করে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ভগवंत মান ও তাঁর সরকারি প্রতিনিধি দলকে অবিলম্বে ফ্রান্স সফরে যাওয়ার আইনি অনুমতি প্রদান করার ঐতিহাসিক নির্দেশিকা জারি করেছে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *