৩৩১ বছরের প্রাচীন ইতিহাস! রানাঘাটের ঐতিহাসিক সদু-বাউনি পুজো ঘিরে আজও কেন কৌতূহল তুঙ্গে?

বাংলার শারদোৎসব মানেই বনেদিয়ানা আর ইতিহাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আর এই ঐতিহ্যের তালিকায় নদীয়ার রানাঘাটের পুরোহিতপাড়ার ‘সদু-বাউনি’ দুর্গাপুজো এক বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে। চলতি বছরে এই ঐতিহাসিক পুজো সাফল্যের সঙ্গে ৩৩১ বছরে পা দিল। জাঁকজমক ও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এই পুজোর পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস, প্রাচীন রীতি আর মানুষের নিখাদ আবেগ। ইতিহাসের কোনো ধূসর পাতা নয়, বরং সাধারণ মানুষের অগাধ বিশ্বাস ও ভক্তির জোরে আজও সগৌরবে বেঁচে রয়েছে এক নারীর মর্মান্তিক অথচ অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি।
এই ঐতিহাসিক পুজোর সূচনা সম্পর্কে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে এক অনন্য উপাখ্যান। কথিত আছে, বহু বছর আগে বাল্যবিধবা সদু দেবী তাঁর শ্বশুরবাড়ি কালনা থেকে এই দুর্গোৎসবের সূচনা করে তা নিয়ে এসেছিলেন নিজের জন্মভিটে তথা সেকালের ব্রহ্মডাঙ্গায়, যা আজকের রানাঘাটের পুরোহিতপাড়া নামে পরিচিত। সেই প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণ নারীদের সম্মানসূচক শব্দ হিসেবে ‘বাউনি’ বলে সম্বোধন করা হতো। আর সেই সূত্র ধরেই এই পুজো পরবর্তীকালে ‘সদু-বাউনি’ পুজো হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শুরুতে এটি একটি নির্দিষ্ট পরিবারের অন্দরে সীমাবদ্ধ পারিবারিক পুজো হলেও, সময়ের নির্মম পরিবর্তন এবং প্রজন্মের হাত ধরে ১৯৭১ সালে এটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ নেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজোর বাহ্যিক রূপ ও সাজসজ্জায় কিছুটা পরিবর্তন এলেও তার মূল শিকড় ও ঐতিহ্য আজও সমানভাবে অটুট রয়েছে। একসময়ের পারিবারিক আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পুজো আজ গোটা পাড়ার এক মহামিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিমার সাবেকি মাটির সাজের জায়গা পরিবর্তন করে বর্তমানে দেবী সেজে ওঠেন আকর্ষণীয় ডাকের সাজে। তা সত্ত্বেও এই পুজোর মূল আকর্ষণ ও মাহাত্ম্য লুকিয়ে রয়েছে এর প্রাচীন ভোগ ও নিয়মনীতির অনন্য পরম্পরায়। প্রবীণ থেকে নবীন, নারী থেকে পুরুষ—প্রত্যেক প্রজন্মের মানুষ পুজোর প্রতিটি কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন, যার ফলে এটি একটি সর্বজনীন উৎসবের চেয়েও বড় পারিবারিক উৎসবে পরিণত হয়।
পুজোর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানেও বজায় রয়েছে শতবর্ষের পুরনো নিখাদ ঐতিহ্য। ষষ্ঠীর দিন দেবীর বিশেষ ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় সুস্বাদু কলাইয়ের ডাল। অন্যদিকে বিজয়া দশমীর দিন দেবীকে নিবেদন করা হয় অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী পান্তা ভাত, কচুর শাক এবং জিভে জল আনা চালতার টক। এছাড়া প্রাচীন প্রথা মেনে আজও এই পুজোয় আখ, কুমড়ো ও কলা বলির রীতিনীতি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়। আধুনিকতার যুগেও নতুন প্রজন্ম অত্যন্ত ভক্তিভরে এই সমস্ত প্রাচীন আচার মেনে চলে। ৩৩১ বছরের এই পথচলায় রানাঘাটের সদু-বাউনির পুজো কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল।