মাস্কের ওপর চটল এসজেএম! রিলায়েন্স বনাম স্টারলিঙ্ক যুদ্ধে ভারতে চরম সংকটে স্পেসএক্স?

জাতীয় নিরাপত্তা, ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং দেশের কোটি কোটি নাগরিকে তথ্যের পরম গোপনীয়তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্বখ্যাত ধনকুবের ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড সংস্থা ‘স্টারলিঙ্ক’-কে ভারতে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর অনুমোদন না দেওয়ার জোরালো দাবি জানাল স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ (SJM)। জাতীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই প্রভাবশালী ভাবাদর্শগত সংগঠনের স্পষ্ট বক্তব্য—স্টারলিঙ্কের ব্যবহৃত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় সীমানার ভেতরের তথ্য যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশের বাইরে আদানপ্রদান হয়, তবে রাষ্ট্রের সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা তথ্য, সরকারি গোপনীয়তা এবং প্রশাসনিক নজরদারি ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে। সুতরাং, ভারত সরকারের নির্ধারিত সমস্ত কড়া নিরাপত্তা সংক্রান্ত পূর্বশর্ত শতভাগ পূরণ না করা পর্যন্ত মাস্কের বাণিজ্যিক সংস্থাকে কোনোভাবেই টেলিকম লাইসেন্স প্রদান করা সঠিক হবে না।

একই সঙ্গে ভারতের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক পরিকাঠামো নিয়ে ইলন মাস্কের সাম্প্রতিকতম আপত্তিকর মন্তব্যেরও তীব্র সমালোচনা করেছে স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ। সংগঠনের জাতীয় সহ-সংযোজক অশ্বিনী মহাজন এক কড়া সরকারি বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন যে, ভারতীয় সার্বভৌমত্বের স্বার্থে ভারত সরকার স্টারলিঙ্কের কাছে জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত একাধিক সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছিল। তবে সেই প্রশাসনিক প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট জবাব এড়িয়ে গিয়ে ইলন মাস্ক ভারতীয় শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে পরোক্ষে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ শানিয়েছেন। মহাজনের দাবি, মাস্কের এই আচরণে পরিষ্কার প্রমাণিত হয় যে স্টারলিঙ্ক ভারতের কড়া নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পালনে একেবারেই প্রস্তুত নয়; বরং তারা সরকারি স্তরে অপ্রয়োজনীয় জনমত তৈরির মাধ্যমে অন্যায্য উপায়ে লাইসেন্স হাতানোর চেষ্টা করছে।

ভারতের মহাকাশ ও টেলিকম মানচিত্রে স্টারলিঙ্কের প্রবেশকে কেন্দ্র করে মূল বিতর্কের সূচনা হয়েছিল মুকেশ অম্বানির মালিকানাধীন রিলায়্যান্স জিও-র সঙ্গে ইলন মাস্কের সমকক্ষ প্রতিযোগিতার সূত্রে। ভারতে স্টারলিঙ্কের অনুমোদন পেতে বিলম্ব হওয়ার পেছনে রিলায়্যান্স গোষ্ঠীর পরোক্ষ কূটনৈতিক প্রভাবের দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছিলেন মাস্ক। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় অম্বানি ও ভারতীয় বাণিজ্য নীতিকে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি তিনি। তবে এই সমস্ত কাল্পনিক অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ভারতীয় টেলিকম ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান নিয়ম প্রযোজ্য। কোনো বিশেষ সংস্থাকে আলাদা সুবিধা দেওয়া বা কাউকে বাধাগ্রস্ত করার কোনো নীতি ভারতের নেই। রিলায়্যান্স জিও-ও স্পষ্ট করেছে যে, তারা সুস্থ প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানালেও যেকোনো বিদেশি সংস্থাকে দেশের আইন ও সার্বভৌমত্ব মেনেই কাজ করতে হবে।

এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ দাবি করেছে যে, শুধুই বাণিজ্যিক মুনাফা নয়, বরং স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ থাকা বাঞ্ছনীয়। স্টারলিঙ্কের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো পর্যবেক্ষণ করে অশ্বিনী মহাজন জানান, তাদের উপগ্রহগুলিতে থাকা ইন্টার-স্যাটেলাইট লেজার লিঙ্কের মাধ্যমে তথ্য কোনো গ্রাউন্ড স্টেশন ছাড়াই এক স্যাটেলাইট থেকে অন্য স্যাটেলাইটে স্থানান্তরিত হতে পারে। এর ফলে ভারতীয় ডেটা দেশের নির্দিষ্ট গেটওয়ে এড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে পাচার হয়ে যাওয়ার বিপুল ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে মণিপুরের মতো সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইতোপূর্বে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করেছে, সেখানে কড়া নিরাপত্তা বিধির সঙ্গে কোনো আপস করা চলবে না।

তাছাড়া দাঙ্গা, সন্ত্রাসবাদ বা দেশবিরোধী কার্যকলাপ দমনে প্রশাসন যখন প্রচলিত ইন্টারনেট বন্ধ রাখে, তখন অনিয়ন্ত্রিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেট দেশদ্রোহী ও পাচারকারীদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, স্বদেশী জাগরণ মঞ্চের পূর্ব ক্ষেত্র কমিটির সদস্য ড. দীপঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মাস্কের সংস্থাকে রোখা হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে কিছুটা কূটনৈতিক টানাপোড়েন হতে পারে; তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমেরিকা সহ যেকোনো বিশ্বশক্তির সঙ্গে টেবিল কূটনীতিতেই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। পরিশেষে, পিএসএলভি ও চন্দ্রযানের সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় মহাকাশ প্রযুক্তিকে স্বাবলম্বী করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সস্তায় সুরক্ষিত ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার ওপরই জোর দিয়েছে স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *