প্রতিমা ছাড়াই হয় মহা দুর্গাপুজো! মাছ-মাংস আর কাঁকড়ার ভোগে শতবর্ষী মন্দিরে কোন রহস্য লুকিয়ে?

দুর্গাপুজো মানেই তো চারদিনের শারদোৎসব, নতুন প্রতিমা, প্যান্ডেল হপিং আর আলোর রোশনাই। কিন্তু বাংলার এক কোণে এমন এক অনন্য পুজো হয়, যেখানে কোনো নতুন প্রতিমা তৈরিই করা হয় না! মন্দিরে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত দেবীকে সরাসরি দুর্গারূপে পুজো করার প্রাচীন ও ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দকুমারের ভবানীপুরের মা ঝিংলেশ্বরী মন্দির (Maa Jhingleswari Temple)। শত শত বছরের পুরনো এই পুজোর রীতিনীতি ও অলৌকিক লোককথা শুনলে যে কারো চোখ কপালে উঠবে।

দেবী আবির্ভাবের রোমহর্ষক লোককথা:
স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরা কাহিনী অনুযায়ী, এককালে নাকি এই গোটা এলাকাটি নদীগর্ভে ছিল। সেই যুগে নদীতে নিয়মিত নৌকা, বোট ও বড় বড় জাহাজ চলাচল করত। কথিত আছে, জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ চালকদের সঙ্গে এক রহস্যময়ী মহিলার কথোপকথন থেকেই প্রথম এই দেবীর আবির্ভাবের কথা প্রচার হয়। স্থানীয়দের গভীর বিশ্বাস, ওই অলৌকিক নারী আর কেউ নন, স্বয়ং দেবী ঝিংলেশ্বরী নিজেই। সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ ও চারপাশের চিত্র বদলালেও বদলায়নি এখানকার পুজোর চিরন্তন ঐতিহ্য।

ভোগে মাছ-মাংস ও কাঁকড়ার অভিনব রীতি:
সাধারণ দুর্গাপুজোর ভোগ বা নিয়মের সঙ্গে মা ঝিংলেশ্বরী মন্দিরের পুজোর কোনো মিলই পাওয়া যাবে না। ষষ্ঠী থেকে দশমী—প্রতিদিনই এখানে চলে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান। পুজোর ভোগেও রয়েছে দারুণ চমক ও বৈচিত্র্য। প্রথা অনুযায়ী, সপ্তমীতে সাত রকম, অষ্টমীতে আট রকম এবং নবমীতে ন’ রকম ভাজা ও তরকারি নিবেদনের রীতি রয়েছে। একটি থালায় যেমন নিরামিষ ভোগ থাকে, তেমনই দেবীকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মাছ, মাংস এবং কাঁকড়া-সহ নানা আমিষ পদও নিবেদন করা হয়। বিশেষ করে স্থানীয় ট্রলার, বোট ও নৌকার মালিকেরা নিজেদের ব্যবসার সাফল্য কামনায় দেবীকে কাঁকড়া নিবেদন করে পুজো দেন।

অষ্টমীর বলির টান ও উপচে পড়া ভিড়:
এই প্রাচীন পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো বলিপ্রথা। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, মনের সমস্ত কামনা নিয়ে মা ঝিংলেশ্বরীর কাছে মানত করলে তা অবধারিতভাবে পূর্ণ হয়। আর সেই মানত শোধ করতেই মহাষ্টমীর দিন মন্দির চত্বরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ভবানীপুর তো বটেই, এমনকি পার্শ্ববর্তী হলদিয়া, তমলুক এমনকি কলকাতা থেকেও বহু মানুষ প্রতি বছর এই ব্যতিক্রমী পুজো দেখতে ও পুজো দিতে ছুটে আসেন।

আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে সর্বস্তরে, বদলে গেছে চারপাশের চারিত্রিক রূপও। কিন্তু শতবর্ষের বিশ্বাস, ভক্তি আর অদ্ভুত সব প্রাচীন রীতিনীতির মেলবন্ধনে আজও সম্পূর্ণ স্বমহিমায় অটুট রয়েছে নন্দকুমারের মা ঝিংলেশ্বরী মন্দিরের এই অনন্য দুর্গোৎসব।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *