“আপনি খুনি, কেন এসেছেন এখানে?” হুইলচেয়ারে বন্দি ইউনূসকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চরম হেনস্থা, তুমুল বিক্ষোভ!

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ তথা বাংলাদেশের প্রাক্তন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখতেই মুখোমুখি হলেন চরম অপমানের। নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি (JFK) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশের নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। বিমানবন্দরে তাঁকে উদ্দেশ্য করে উড়ে আসে ‘জঙ্গি’ ও ‘খুনি’ কটাক্ষ। এমনকি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে শত শত মানুষের মৃত্যু, গণতন্ত্রের বিনাশ এবং পুলিশ হত্যার জন্য সরাসরি ইউনূসকেই দায়ী করেন বিক্ষোভকারীরা।

কী ঘটেছিল বিমানবন্দরে?
বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহা থেকে কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইটে টার্মিনাল-৮-এ পৌঁছান মহম্মদ ইউনূস। বিমানবন্দর থেকে যখন তাঁকে হুইলচেয়ারে করে বের করা হচ্ছিল, ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত প্রবাসীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, ক্ষুব্ধ জনতা তাঁর দিকে তেড়ে গিয়ে বিকট শব্দে চিৎকার করে বলছেন, “আপনি একজন জঙ্গি! আপনি বাংলাদেশে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছেন। আপনি কেন এখানে এসেছেন? আমাদের বলুন, কেন এসেছেন?” পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে এবং তাঁর সফরসঙ্গী লামিয়া মোরশেদকে দ্রুত বিমানবন্দরের ভেতরে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যান। বিক্ষোভকারীদের অনেকের দাবি ছিল, তাঁকে অবিলম্বে বাংলাদেশে ‘ফিরে যেতে’ হবে।

কী কী অভিযোগ তুললেন প্রবাসীরা?
বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ—২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। এই সময়ে প্রায় ২ লাখ মানুষকে অহেতুক গ্রেফতার করা হয় এবং হাজার হাজার পুলিশকর্মী ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর নৃশংস আক্রমণ চালানো হয়। পাশাপাশি ইউনূসের তৈরি ‘গ্রামীণ গ্রুপ’-এর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্তের দাবিও তোলা হয় মার্কিন মুলুকের রাজপথ থেকে।

যদিও এই বিক্ষোভকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট নয়, তবে স্থানীয় কিছু সংবাদমাধ্যমের দাবি—বিক্ষোভকারীরা ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের সমর্থক। তবে এই কটাক্ষ ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির বিষয়ে ইউনূস বা তাঁর সহযোগীদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিতর্কিত অধ্যাদেশ:
ইউনূস প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণগ্রেফতার, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু এবং সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় ও তাঁদের উপাসনালয়ের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় সঠিক তদন্ত না করার অভিযোগ রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও।

বিশেষ করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউনূস একটি বিতর্কিত অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। সেই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হিংসাত্মক ঘটনায় যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি তদন্ত চালানো পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। সাধারণ বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে সোপর্দ করা হয়েছিল, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি:
ইউনূসের দায়িত্ব পালনকালে ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গিয়েছিল। মার্চ ২০২৫-এ চীনের একটি অনুষ্ঠানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলি নিয়ে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য এবং বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা না দেওয়া নিয়ে ভারতের বারবার সতর্কবার্তাকে তোয়াক্কা না করার অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা তাঁর এই পদক্ষেপকে ‘বিপরীত ফলদায়ক কূটনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আমেরিকার মাটিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশের এই বিস্ফোরক বিক্ষোভ প্রমাণ করে যে, মেয়াদ শেষে ক্ষমতা থেকে সরলেও এবং নোবেলজয়ী ভাবমূর্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে প্রবাসীদের একাংশের ক্ষোভ এখনও তুঙ্গে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *