৬০ শতাংশ ঋণগ্রহীতার EMI তাঁদের মাসিক আয়ের চেয়েও বেশি, বেহিসেবি খরচের আগে জানুন

নতুন ফোন কেনা, পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটানো কিংবা প্রিয়জনকে সাধের উপহার দেওয়া—উৎসবের মরশুম মানেই চারদিকে খুশির জোয়ার। কিন্তু সঞ্চয়ে টান পড়লে সেই শখের খরচ মেলাতে আজকাল অনেকেই ঋণ বা ক্রেডিট কার্ডের দ্বারস্থ হন। অল্প একটু মাসিক কিস্তি বা ইএমআই (EMI)-এর লোভে অনেকেই অজান্তেই ঋণের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু উৎসবের কয়েকদিনের আনন্দ মেটাতে গিয়ে নেওয়া এই ঋণই যে পরবর্তীতে গোটা সংসারের জন্য মস্ত বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে, তা কি আমরা ভেবে দেখি?
বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও ঋণ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সাম্প্রতিক তথ্য দেখলে যে কারও কপালে ভাঁজ পড়বে। চলুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক উৎসবের বাজারে আমাদের আর্থিক অসচেতনতা ঠিক কতটা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে।
ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত: পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণগ্রহীতার ইএমআই (EMI)-এর পরিমাণ তাঁদের পরিবারের মোট মাসিক আয়ের সমান, কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি! এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ পুরনো ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে নতুন করে লোন নিচ্ছেন কিংবা ক্রেডিট কার্ডের সাহায্য নিচ্ছেন।
সবাই অবশ্য শপিং বা ঘোরার জন্য ঋণ নিচ্ছেন না। তথ্য বলছে, ঋণ নেওয়ার নেপথ্যে ২৬ শতাংশ কারণ হলো চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্যজনিত প্রয়োজন। এছাড়া ২২ শতাংশ মানুষ বিয়ে বা পড়াশোনার খরচ এবং ১৮ শতাংশ ব্যবসা বা চাকরির প্রয়োজনে ঋণ নেন। তবে সংসার চালানো বা দৈন্যন্দিন খরচ মেলাতে ঋণ নেওয়ার হারও কম নয় (১৫ শতাংশ)। কিন্তু এই কাঠখড় পোড়ানো অবস্থার মধ্যেও যদি উৎসবের কেনাকাটার জন্য নতুন করে ঋণ নেওয়া হয়, তবে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
কেন ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে? নিয়মিত আয় থাকলেও চাকরি চলে যাওয়া, বেতন কমে যাওয়া কিংবা হঠাৎ কোনো বড় খরচ চলে আসার মতো পরিস্থিতির কারণে ইএমআই দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ‘এক্সপার্ট প্যানেল’-এর তথ্য অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধে সমস্যার মুখে পড়া ৩১ শতাংশ ক্ষেত্রে চাকরি হারানো বা আয় হ্রাসের বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে, আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ইএমআই (২৮%) এবং একাধিক ঋণ বা অতিরিক্ত ধার (১৯%) মানুষকে বিপদে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ডিরেক্টর অনুরাগ মেহরা জানাচ্ছেন, উৎসবের সময় আবেগ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং উদযাপনকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই সাধ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করেন। কিন্তু সেই খরচের জন্য লোন নিলে সাময়িক আনন্দ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে রূপ নেয়। বহু মানুষের আয়ের সিংহভাগই ইতিমধ্যে ইএমআই দিতে চলে যাচ্ছে, ফলে নতুন ঋণ নেওয়ার আগে পরিস্থিতি বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
উৎসবের কেনাকাটায় ঋণ নেওয়ার আগে কী করবেন? উৎসবের বাজারে বিভিন্ন সংস্থার আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট, ক্যাশব্যাক বা নো-কস্ট ইএমআই-এর ফাঁদে পা দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার:
-
সবার আগে দেখতে হবে আপনার মাসিক আয়ের কত অংশ ইতিমধ্যে ইএমআই বা ক্রেডিট কার্ডের বিল মেটাতে চলে যাচ্ছে।
-
নতুন লোন নিলে মাসিক কিস্তি কত বাড়াবে এবং মোট সুদের পরিমাণ কত হবে, তার পরিষ্কার হিসাব করুন।
-
হঠাৎ কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে সেই অর্থ সামলানোর ক্ষমতা আপনার আছে কি না, তা যাচাই করুন।
উৎসবের আনন্দ মাত্র কয়েকদিন বা সপ্তাহের। কিন্তু তার জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি বয়ে বেড়াতে হয় মাসের পর মাস। তাই সাময়িক উত্তেজনার বশে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কি আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ? একটু সংযত হয়ে বাজেট মেনে চললেই উৎসবের আসল আনন্দ চিরস্থায়ী হতে পারে।