“এখন গাড়িই বলবে কোন রাস্তায় ট্র্যাফিক জ্যাম!” দিল্লিতে আইএমসি ২০২৬-এ মোদী সরকারের হুলস্থূল ফেলে দেওয়া প্রযুক্তি

সকালে কাজের তাগিদে বা অফিসে যাওয়ার পথে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে পড়া এবং লেট হওয়ার দুশ্চিন্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক বড় ভোগান্তি। কিন্তু একবার ভাবুন তো, আপনার যাত্রা কতটা সহজ হয়ে উঠত যদি আপনার গাড়িটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগাম ট্র্যাফিক জ্যামের খবর দিত, সবচেয়ে ফাঁকা রাস্তার সন্ধান বের করে দিত এবং সেই অনুযায়ী মোড়ের ট্র্যাফিক লাইটগুলো নিজে থেকেই সবুজ হয়ে যেত! এটি আর কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়, এটিই হতে চলেছে ভবিষ্যতের ‘স্মার্ট মোবিলিটি’। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শুরু হওয়া ডিজিটাল বিপ্লব এখন আমাদের গাড়ি, রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে কারখানাতেও পৌঁছে যাচ্ছে।
গত ৭ থেকে ১০ অক্টোবর দিল্লির যশোভূমিতে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেস (IMC 2026)’-এর দশম সংস্করণে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনশীল বিশ্বের এক অনন্য ঝলক দেখা গিয়েছে।
প্রযুক্তির মহাবিপ্লব: ১৩.৫ বিলিয়ন মোবাইল ব্যবহারকারী ভারতে
আইএমসি ২০২৬-এর এবারের মূল বিষয় ছিল “সীমাহীন প্রসার”। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, মোবাইল ফোন ভারতের যাতায়াত, ব্যাংকিং, শিক্ষা এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নেওয়ার পদ্ধতিকে আগের চেয়ে অনেক সহজ ও সুগম করে তুলেছে।
কেন্দ্রীয় টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে ১৩.৫ বিলিয়নেরও বেশি মোবাইল ব্যবহারকারী এবং ১০.৯ বিলিয়নেরও বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন। দেশের ৯৯.৯% জেলায় ইতিমধ্যেই ৫.৫ লক্ষেরও বেশি ৫জি (5G) বেস স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে, যা আগামীর এই সংযুক্ত প্রযুক্তিকে চালিত করতে মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।
‘চাকাযুক্ত কম্পিউটার’ এবং V2V প্রযুক্তি: কীভাবে পথ দেখাবে আপনার গাড়ি?
ভবিষ্যতের গাড়িগুলি আর কেবল যাতায়াতের মাধ্যম থাকবে না, বরং সেগুলি কাজ করবে এক-একটি ‘চাকাযুক্ত কম্পিউটার’ হিসেবে। সংযুক্ত বা কানেক্টেড কারগুলি ইন্টারনেট এবং আশেপাশের অন্যান্য যানবাহন থেকে রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহ করে চালকদের রাস্তার অবস্থা, যানজট এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা সম্পর্কে আগেই সতর্ক করে দেবে।
উল্লেখ্য, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের আগস্ট মাস থেকেই ‘যানবাহন-থেকে-যানবাহন’ বা ভেসেল-টু-ভেসেল (V2V) যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য খসড়া নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রাস্তায় কোনো গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষলে বা দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হলে আশেপাশের সমস্ত যানবাহন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পেয়ে যাবে। অটো কনসালটেন্সি ‘জাটো ডাইনামিক্স’-এর মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে ভারতে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়িগুলির মধ্যে প্রায় ২৭.৪% গাড়িই ছিল এই কানেক্টেড প্রযুক্তিসম্পন্ন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও চাকরির পরিবর্তনশীল মানচিত্র
প্রযুক্তির এই জোয়ারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং স্মার্ট সেন্সর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যন্ত্রপাতির সম্ভাব্য ত্রুটি আগেই চিহ্নিত করে উৎপাদনে গতি আনছে এআই। তবে এর ফলে চাকরির বাজারেও এক বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে।
এআই বিশেষজ্ঞ অভিষেক নিগমের মতে, প্রথাগত বা গতানুগতিক কাজগুলি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ার ফলে কিছু পুরানো চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে, কিন্তু বিপরীতে রোবট পরিচালনা, প্রোগ্রামিং এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো আধুনিক ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এই কারণে তরুণদের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।
ছোট শহর ও গ্রামের কৃষি-ব্যবস্যায় এআই-এর ভূমিকা
শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস বা শর্টস বানানোর মধ্যেই এআই-এর কাজ সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। ছোট শহর ও গ্রামে যদি স্থানীয় ভাষায় এবং সুলভ মূল্যে এআই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে সাধারণ কৃষকরা ফসল রক্ষা ও চাষবাস সংক্রান্ত উপযুক্ত পরামর্শ পেতে পারেন। পাশাপাশি গ্রামীণ ছোট ব্যবসাগুলিও নতুন গ্রাহকদের কাছে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবে।
তবে প্রযুক্তি যতই এগোচ্ছে, অবস্থান ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বা ডেটা সুরক্ষার চ্যালেঞ্জও তত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক স্মার্ট পৃথিবীর প্রকৃত সুফল তখনই পাওয়া সম্ভব, যখন প্রযুক্তি কেবল যন্ত্রপাতির উন্নতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করবে এবং গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সবার জন্য উন্নতির সমান সুযোগ তৈরি করবে।