রামায়ণের লক্ষ্মণ হতে চাননি সুনীল! রামানন্দ সাগরের কোন চাঞ্চল্যকর চক্রান্তে বদলে গিয়েছিল অভিনেতার ভাগ্য?

ভারতীয় টেলিভিশনের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় ও আইকনিক ধারাবাহিক রামানন্দ সাগরের ‘রামায়ণ’। এই পৌরাণিক মেগার প্রতিটি চরিত্রই যেন আজও দর্শকদের মনে এক বিশেষ ও অমর স্থান অধিকার করে রয়েছে। রাম, সীতা, হনুমান থেকে শুরু করে লক্ষ্মণ—সব চরিত্রেই অভিনেতাদের নিখুঁত অভিনয় আজও দর্শকদের স্মৃতিতে অম্লান। বিশেষ করে লক্ষ্মণের চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন অভিনেতা সুনীল লাহিড়ী। তবে জানলে অবাক হবেন, এই চরিত্রের জন্য আদতে প্রথম পছন্দ ছিলেন না তিনি। বরং ভাগ্যের এক অদ্ভুত ফেরে অন্য একটি চরিত্রে অভিনয় করতে করতেই লক্ষ্মণ হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যান অভিনেতা!

প্রথমে রামায়ণে কাজ করতেই চাননি সুনীল
এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা সুনীল লাহিড়ী নিজেই ফাঁস করেছিলেন যে, শুরুতে তিনি রামানন্দ সাগরের এই মেগা প্রজেক্টে অভিনয় করার ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। পরে প্রেম সাগরের বিশেষ অনুরোধেই তিনি শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকে কাজ করতে রাজি হন। তবে শর্ত ছিল একটাই—যদি অভিনয় করতেই হয়, তবে তিনি কেবল লক্ষ্মণের চরিত্রেই অভিনয় করবেন। রাম, ভরত কিংবা শত্রুঘ্নের মতো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তাঁর ছিল না।

স্কুলে পড়ার সময় লক্ষ্মণ চরিত্রটি সম্পর্কে যা জেনেছিলেন, তার সঙ্গে নিজের স্বভাবের এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেতেন সুনীল। তাঁর মনে হয়েছিল, লক্ষ্মণের দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও আচরণের সঙ্গে তাঁর নিজের মানসিকতার যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে। সেই কারণেই এই চরিত্রের প্রতি তাঁর এক অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল।

শত্রুঘ্ন থেকে কীভাবে এল লক্ষ্মণের চরিত্র?
প্রাথমিকভাবে লক্ষ্মণের চরিত্র না পাওয়ায় সুনীল ভেবেছিলেন তিনি আর এই ধারাবাহিকে কাজই করবেন না। কিন্তু সেই মুহূর্তে প্রেম সাগর তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, অন্তত শত্রুঘ্নের চরিত্রে অভিনয় করলে পরিচালক রামানন্দ সাগরের নজরে আসার একটা সুযোগ থাকবে। সেই পরামর্শ মেনে শেষ পর্যন্ত শত্রুঘ্নের চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হন তিনি এবং বেশ কয়েকটি পর্বের শুটিংও করে ফেলেন। সেই সময় অবশ্য লক্ষ্মণের চরিত্রে অভিনয় করছিলেন অন্য এক অভিনেতা, শশী পুরী। তবে ওই ধারাবাহিকটি আদৌ কবে এবং কোন চ্যানেলে সম্প্রচারিত হবে, তা নিয়ে তখনও চরম অনিশ্চয়তা ছিল।

এর পরেই সুনীলের জীবনে সেই মোড় ঘোরানো মুহূর্তটি আসে। একদিন অন্য একটি প্রোজেক্টের শুটিংয়ে যাওয়ার পথে তাঁর সামনে এসে থামে রামানন্দ সাগরের গাড়ি। পরিচালক তাঁকে ডেকে গাড়িতে বসতে বললেও শুটিংয়ের ব্যস্ততার কারণে সেদিন সুনীল যেতে পারেননি। পরে রামানন্দ সাগর তাঁর অফিস থেকে লোক পাঠিয়ে সুনীলকে ডেকে পাঠান এবং সরাসরি জানান যে, তিনি তো শুরু থেকেই লক্ষ্মণের চরিত্রে অভিনয় করতে চেয়েছিলেন, তাই এবার তিনি সেই মুখ্য চরিত্রেই অভিনয় করতে পারেন!

শশীর পরামর্শেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
যদিও সুনীলের মনে তখন বড় প্রশ্ন ছিল—লক্ষ্মণের চরিত্রে তো ইতিমধ্যেই শশী পুরী অভিনয় করছেন! জবাবে রামানন্দ সাগর তাঁকে জানান যে, ধারাবাহিক সম্প্রচার নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় শশী পুরী কাজটি ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পরিচালকের কাছে দু’দিন সময় চান সুনীল।

বাড়ি ফিরে তিনি সরাসরি ফোন করেন শশী পুরীকে। সবটা শোনার পর শশী পুরী বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সুনীলকে সাফ জানিয়ে দেন যে, এই দারুণ সুযোগ যেন তিনি কোনোভাবেই হাতছাড়া না করেন। শশীর সেই উৎসাহ ও পরামর্শেই ভরসা রেখে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্মণের চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হন সুনীল লাহিড়ী। এভাবেই শত্রুঘ্নের ছোট চরিত্র থেকে শুরু করা সুনীল হয়ে ওঠেন রামানন্দ সাগরের ‘রামায়ণ’-এর কালজয়ী ‘লক্ষ্মণ’, যা তাঁর অভিনয় জীবনের গতিপথ চিরকালের মতো বদলে দিয়েছিল।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *