সাধারণ ডিহাইড্রেশন নাকি কিডনি বিকল হওয়ার ইঙ্গিত? পর্যাপ্ত জল খেয়েও এই ৮টি লক্ষণ দেখলে সাবধান!

শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো কিডনি। তবে চিন্তার বিষয় হলো, কিডনির সমস্যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ তৈরি করে না। উলটে শরীরের জলের ঘাটতি বা সাধারণ ডিহাইড্রেশনের লক্ষণের সঙ্গে কিডনির নানা সমস্যার অদ্ভুত মিল থাকায় অনেকেই বিষয়টি শুরুতে বুঝতে পারেন না। ক্লান্তি, পেশিতে আচমকা টান ধরা, বমি বমি ভাব কিংবা প্রস্রাবের রং ও গঠনের পরিবর্তনের মতো লক্ষণকে সাধারণ গরম বা ক্লান্তিজনিত সমস্যা ভেবে আমরা অনেকেই এড়িয়ে যাই। তবে পর্যাপ্ত জল পান করার পরেও যদি এই উপসর্গগুলি শরীরে একটানা থেকে যায়, তবে চিকিৎসকদের মতে অবিলম্বে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

১. পর্যাপ্ত জল পান করার পরেও চরম ক্লান্তি
সারাদিনে পর্যাপ্ত জল পান ও বিশ্রাম নেওয়ার পরেও যদি আপনি অনবরত শারীরিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করেন, তবে বিষয়টি একেবারেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে রক্ত থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ সঠিকভাবে ছেঁকে বের হতে পারে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শরীরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতার ওপর।

২. পেশিতে আচমকা টান বা ক্র্যাম্প ধরা
শরীরে জলের ঘাটতি হলে যেমন পেশিতে টান ধরে, তেমনই কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলেও এই একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। আসলে কিডনি আমাদের শরীরে পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খনিজের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই খনিজের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, ফলে পেশিতে ঘন ঘন টান ধরে।

৩. একটানা বমি বমি ভাব বা অস্বস্তি
শরীরে ডিহাইড্রেশনের কারণে অসুস্থ বোধ করা কিংবা বমি বমি ভাব হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু রক্তে জমা ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ যখন কিডনি বের করতে ব্যর্থ হয়, তখন শরীরে টক্সিন জমে গিয়ে একই ধরনের বমি বমি ভাব বা অস্বস্তি তৈরি করে। দীর্ঘদিন এই সমস্যা বজায় থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৪. মুখ শুকিয়ে যাওয়া ও নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ
প্রচুর জল খাওয়ার পরেও যদি বার বার মুখ শুকিয়ে যায় বা মুখে এক ধরনের ধাতব স্বাদ পান, তবে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কিডনির মারাত্মক কোনো সমস্যা হলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমার ফলে নিঃশ্বাসে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ সৃষ্টি হতে পারে।

৫. প্রস্রাবের রং ও গঠনে মারাত্মক পরিবর্তন
শরীরে জলের ঘাটতি হলে সাধারণত গাঢ় রঙের প্রস্রাব হয়। কিন্তু যদি দেখেন প্রস্রাবে বার বার অতিরিক্ত ফেনা হচ্ছে, তবে তা প্রস্রাবের সঙ্গে শরীর থেকে প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত হতে পারে। কিডনির ছাঁকন বা ফিল্টার প্রক্রিয়া ব্যাহত হলেই মূলত এমনটি ঘটে। এমন সমস্যা নিয়মিত হলে অবিলম্বে প্রস্রাব পরীক্ষা করানো উচিত।

৬. সকালে চোখের চারপাশে ফোলাভাব
ডিহাইড্রেশনের সময় শরীরে জলের ঘাটতি তৈরি হয়। অন্যদিকে, কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করলে শরীর থেকে অতিরিক্ত জল ও সোডিয়াম বাইরে বেরোতে পারে না। এছাড়া প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়ার কারণেও শরীরে জল জমতে শুরু করে, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের চারপাশ অস্বাভাবিক ফুলে থাকা কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।

৭. মনোযোগের অভাব ও চিন্তাভাবনায় ধোঁয়াশা
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরেও যদি কাজে একদম মনোযোগ দিতে না পারেন বা মাথা সবসময় ঝিমঝিম করে, তবে সাবধান হওয়া জরুরি। কিডনির কার্যক্ষমতা গুরুতরভাবে কমে গেলে রক্তে জমে থাকা টক্সিন সরাসরি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়।

৮. সারা শরীরে চুলকানি ও কোমরের কাছে বিশেষ ব্যথা
ডিহাইড্রেশনের ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে সামান্য চুলকানি হতে পারে। তবে কিডনির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় শরীরে খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হলে এবং রক্তে বর্জ্য জমা হলে অনবরত চুলকানি দেখা দেয়। একইসঙ্গে কোমরের পেছনে বা পাঁজরের নিচে একপাশে বা দু’পাশে একটানা তীব্র ব্যথা হলে তা কিডনিতে পাথর বা সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।

কখন সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
যথেষ্ট পরিমাণে জল পান করা সত্ত্বেও যদি ক্লান্তি, পেশিতে টান, প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা, সকালে মুখ ও চোখের চারপাশ ফুলে যাওয়া কিংবা কোমরের পেছনে স্থায়ী ব্যথার মতো উপসর্গ বজায় থাকে, তবে আর দেরি করবেন না। অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তে ক্রিয়েটিনিন (Creatinine), ইজিএফআর (eGFR) এবং নিয়মমাফিক প্রস্রাব পরীক্ষার (Routine Urine Test) মাধ্যমে নিজের কিডনির স্বাস্থ্য ও কার্যক্ষমতা যাচাই করে নিন।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *