ভোর হতেই খুলে গেল শতাব্দীপ্রাচীন তোরণ! ‘আলোর বেণু’র সুরে হরকুটির রায়-ব্যানার্জি বাড়িতে গায়ে কাঁটা দেওয়া মুহূর্ত

দেবীপক্ষের পুণ্যলগ্নে মহালয়ার ভোরে যখন গোটা বাংলা মেতে উঠেছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের সুরে, ঠিক তখনই উত্তর কলকাতার এক শতাব্দীপ্রাচীন বনেদি বাড়িতে ধরা পড়ল এক অবিশ্বাস্য ও মন ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্য। ৩৩৪ বছরেরও বেশি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী হরকুটির রায়-ব্যানার্জি বাড়িতে মহালয়ার ভোরেই ঘটল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সমাহার, যার সাক্ষী থাকতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমালেন ঠাকুরদালানে।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই খুলে দেওয়া হয় এই ঐতিহ্যমণ্ডিত বাড়ির প্রকাণ্ড সিংহদুয়ার। এরপর শুরু হয় সেই অভূতপূর্ব আচার—যা আক্ষরিক অর্থেই উপস্থিত সকলের গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো।
‘বাজল তোমার আলোর বেণু’ আর মায়ের চোখে তুলির টান
একদিকে চারপাশের বাতাসে ভাসছে আকাশবাণীর সেই চিরন্তন স্তোত্রপাঠ ও সুর—”বাজল তোমার আলোর বেণু…”। পরিবারের প্রবীণ থেকে নবীন, সকলেই হাতজোড় করে একসঙ্গে শুনছেন দেবীর আবাহনী বার্তা। ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই মৃৎশিল্পীর নিপুণ হাতে ঘটে চলেছে দুর্গা প্রতিমার চক্ষুদান পর্ব।
সাধারণত মহালয়ার দিনে মাটির প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও চক্ষুদানের যে চিরাচরিত রীতি রয়েছে, তা সুর ও আবহসঙ্গীতের এমন যুগলবন্দিতে রূপ নিতে সচরাচর দেখা যায় না। সেই অনন্য ক্ষণেই ঠাকুরদালান এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক আবহে রূপ নেয়।
ইতিহাসের আঁতুড়ঘরে নতুন প্রজন্মের মেলবন্ধন
উত্তর কলকাতার হরকুটির রায়-ব্যানার্জি বাড়ির দুর্গাপুজো কেবল একটি উৎসব নয়, বরং শহরের এক জীবন্ত ইতিহাস। এই পুজোর প্রতিটি স্তম্ভ ও ইটের খাঁজে মিশে রয়েছে কয়েকশো বছরের বহু স্মৃতিকথা। একসময় কলকাতার যেসব মনীষী ও কৃতী ব্যক্তিত্বদের পদধূলি পড়েছিল এই আঙিনায়, আজ দেবীপক্ষের শুভ সূচনাতেও সেখানে দেখা গেল নতুন প্রজন্মের আন্তরিক উচ্ছ্বাস। ঐতিহ্যের সেই খাঁটি রূপটিকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ না করে যেভাবে পরিবারের তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে এসেছে, তা শহরবাসীর নজর কেড়েছে।
দেবীপক্ষের আবাহনে আধুনিকতার চড়া রোশনাইকে ছাপিয়ে মহালয়ার এই প্রাচীন ও খাঁটি বনেদি আচার যেন মনে করিয়ে দিল—বাঙালির দুর্গাপুজোর আসল প্রাণভোমরা আজও লুকিয়ে রয়েছে এই ধরনের ইতিহাসবিজড়িত বাড়ির ঠাকুরদালানেই।