প্লাস্টিক বা থার্মোকল নয়! পাটের তৈরি মুকুটে সেজে উঠছে দুর্গাপ্রতিমা, বাংলার এই গ্রামের তাক লাগানো সাফল্য

সরকারি সহায়তার চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে উপার্জনের নিজস্ব পথ তৈরি করছেন গ্রামীণ নারীরা। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দকুমার ব্লকের বাবুলপুর গ্রাম আজ সেই নিভৃত সাফল্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সংসারের যাবতীয় কাজ সামলানোর পাশাপাশি এ গ্রামের গৃহবধূ ও প্রবীণ নারীরা নিজেদের তৈরি সোনালি আঁশের নান্দনিক শিল্পকর্ম দিয়ে পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছেন। পাটকে কেন্দ্র করে তাঁদের এই নিরবচ্ছিন্ন উদ্যোগ কেবল বাড়তি আয় সুনিশ্চিত করছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ করছে নতুন মাত্রা। (ছবি ও তথ্য – সৈকত শী)
চার মাসের প্রস্তুতি ও রকমারি শিল্পকর্ম:
নিত্যদিনের গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত শক্ত করছেন এই নারীরা। শেষ চার-পাঁচ বছর ধরে বাবুলপুরের মহিলারা নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলছেন পাটের নানাবিধ সামগ্রী। পাটের সুতো আর তন্তু দিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রতিমার ঐতিহ্যবাহী মুকুট, দেব-দেবীর দৃষ্টিনন্দন অলংকার এবং আধুনিক নানাবিধ উপহার সামগ্রী। সারা বছর অন্যান্য জিনিসপত্র বানানো হলেও, দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে কাজের ব্যস্ততা পৌঁছায় তুঙ্গে। উৎসবের মরসুমের আগে টানা চার মাস ধরে চলে প্রতিমার গয়না তৈরির কাজ।
জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে ভিন জেলায় কদর:
নন্দকুমারের এই নারীদের তৈরি পাটের শিল্পকর্ম আজ আর কেবল স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে উত্তরবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে তাঁদের শিল্পদ্রব্য। এই স্বনির্ভরতার পিছনের চালিকাশক্তি নারীদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা।
উদ্যোগী শিল্পী মমতা কর জানান, একসময় তাঁর জীবনের পরিধি ছিল কেবল চার দেয়ালের গৃহস্থালির কাজেই সীমিত। পরবর্তীতে তিনি পাট থেকে রকমারি সামগ্রী ও দেব-দেবীর অলংকার তৈরির কারিগরি শেখেন। শুরুতে একা কাজ করলেও, মমতা দেবীর সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের অন্য গৃহবধূরাও এগিয়ে আসেন। বর্তমানে তিনি অন্য মহিলাদেরও এই কাজে দক্ষ করে তুলেছেন। ফলে এক যৌথ প্রয়াসে পুরো গ্রামেই এখন হস্তশিল্পের এক নতুন জোয়ার এসেছে এবং সবাই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
অপর এক কারিগর পার্বতী মণ্ডলের কথায়, টানা চার বছর ধরে কাজ করে সংসারের খরচ সামলানোর মতো ভালো উপার্জন হচ্ছে। এই সাফল্য কেবল আর্থিক প্রাপ্তির অঙ্কেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি গ্রামীণ মহিলাদের সামাজিক আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির এক বলিষ্ঠ আখ্যান। গৃহস্থালির দায়িত্ব পালন করেও কীভাবে দক্ষতার জোরে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, বাবুলপুরের এই মডেল আজ তার অনন্য নজির। সোনালি আঁশের ওপর ভর করে এই গৃহবধূরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্ত মাটি তৈরি করা সম্ভব। (ছবি ও তথ্য – সৈকত শী)