এক ধাক্কায় ১০ লক্ষ কোটি ধূলিসাৎ! সপ্তাহের শেষ দিনে বাজারের এই ঘুরে দাঁড়ানো কি সত্যি স্বস্তির, নাকি বড় ঝড়ের পূর্বাভাস?

বেশ কিছুদিন ধরে ভারতীয় শেয়ার বাজারের লাগাতার পতন সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্পপতি— সকলের মনেই গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। সাপ্তাহিক এই রক্তক্ষয় দেখে রীতিমতো শঙ্কিত ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তবে লেনদেন সপ্তাহের শেষ দিন, শুক্রবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে বাজার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর অবিলম্বে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম খানিকটা কমে আসে। যার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ শেয়ার বাজারেও।
আগের দিনের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় এদিন সেনসেক্স ও নিফটি সূচক ঊর্ধ্বমুখী ধারায় লেনদেন শেষ করেছে। তবে মাত্র একদিন আগেই, বৃহস্পতিবারের এক রক্তক্ষয়ী পতনে দালাল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের ১০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ চোখের পলকে স্রেফ হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। এমন বিপুল পরিমাণ ক্ষতির পর শুক্রবারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা হলেও আশার আলো জ্বেলেছে, যদিও বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে আশঙ্কা কাটছেই না।
টানা ৯ সপ্তাহের মন্দা ও বৈশ্বিক চাপ:
শুক্রবার সাময়িক তেজিভাব দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে বাজারের পরিস্থিতি এখনও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান বলছে, এই নিয়ে টানা নবম সপ্তাহে ভারতীয় বাজারে পতন রেকর্ড করা হলো। অপরিশোধিত তেলের দামের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি, মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার ক্রমাগত দুর্বল হওয়া, বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (FII) লাগাতার শেয়ার বিক্রি এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলির কিছুটা দুর্বল আর্থিক ফলাফল— সব মিলিয়ে বাজারের ওপর পর্বতপ্রমাণ চাপ সৃষ্টি করেছে। এই চরম মন্দার বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন যে তাঁরা তাঁদের কষ্টার্জিত মূলধন কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন।
এই চরম বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক দূর করতে ট্রাস্ট মিউচুয়াল ফান্ডের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার (CIO) মিহির ভোরা বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং এর আগামী দিনগুলির গতিপথ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। তাঁর মতে, শুক্রবারের বাজার চাঙ্গা হওয়া মানেই সব বিপদ কেটে গেছে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। এখনও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। যেমন— যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম এবং মার্কিন বন্ডের ইল্ডের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান। এর পাশাপাশি আবহাওয়ার ক্ষেত্রে এল নিনোর (El Nino) প্রভাবও বাজারের সেন্টিমেন্টকে প্রভাবিত করছে। এই সমস্ত বৈশ্বিক প্রতিকূলতার কারণেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনও ভারতে নতুন করে বড় বিনিয়োগ করতে ভরসা পাচ্ছেন না।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি শক্তপোক্ত হলেও বাধা বিশ্ববাজার:
মিহির ভোরের মতে, ভারতীয় বাজারের মূল সমস্যাগুলো দেশের ভেতর থেকে আসছে না, বরং তা আমদানিকৃত বৈশ্বিক চাপ। উন্নত দেশগুলিতে বন্ডের ক্রমবর্ধমান সুদ এবং কাঁচামাল ও জ্বালানির উচ্চ মূল্য সরাসরি আমাদের বাজারকে প্রভাবিত করছে। একটানা দুর্বল পারফরম্যান্সের ফলে বর্তমানে ভারতীয় শেয়ারগুলির মূল্যায়ন অত্যন্ত সস্তা এবং আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের জোরালো ধারণা ছিল যে এই কম দাম বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আবারও ভারতে লগ্নি করতে টেনে আনবে।
কিন্তু অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম এবং মার্কিন বন্ডের ইল্ডের কারণে সেই আশার বেলুন আপাতত চুপসে গেছে। যার ফলে এফআইআই (FII)-দের প্রত্যাবর্তনের পথ আরও কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বুনিয়াদ অত্যন্ত শক্তিশালী ও চমৎকার। গত জুন ত্রৈমাসিকে দেশের বহু কর্পোরেট সংস্থা দারুণ আর্থিক ফলাফল উপহার দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও আমাদের দেশের কোম্পানিগুলি তাদের মুনাফার মার্জিন ধরে রাখতে সফল হয়েছে এবং বাজারে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও বেশ জোরালো রয়েছে। তা সত্ত্বেও, বৈশ্বিক কারণগুলির খেসারত হিসেবে বাজারকে সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াতে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।
কোন কোন খাতে পড়বে এর প্রভাব?
বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেই এখন বিনিয়োগকারীদের প্রধান নজর রয়েছে আসন্ন কর্পোরেট ত্রৈমাসিক ফলাফলের দিকে। এই প্রসঙ্গে মিহির ভোরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুরো সূচকের দিকে চোখ না রেখে বরং খাতভিত্তিক (Sector-wise) পরিস্থিতি বিচার করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, আগামী দিনগুলিতে বিশেষ করে এফএমসিজি (FMCG), সাধারণ ভোগ্যপণ্য এবং অটোমোবাইল খাতের কোম্পানিগুলির ফলাফল খানিকটা দুর্বল হতে পারে। এছাড়া পেইন্ট বা সমগোত্রীয় অন্যান্য শিল্পের ওপরও এই মন্দার আংশিক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এই ধরনের আশঙ্কাজনক ফলাফলে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই বলেই মনে করেন এই বাজার বিশেষজ্ঞ। বিনিয়োগকারীদের উচিত মূলত দেখা যে কোন কোম্পানিগুলির পণ্যের প্রকৃত চাহিদা বাজারে বজায় রয়েছে এবং কোন সংস্থার মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা (Pricing Power) ভালো। এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও যে সমস্ত কোম্পানি নিজেদের পণ্যের চাহিদা ও বাজার ধরে রাখতে পারবে, বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারাই দ্রুততম গতিতে ঘুরে দাঁড়াবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ফিরলেই চাঙ্গা হবে ব্যাঙ্কিং সেক্টর:
মিহির ভোরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যখনই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুনরায় ভারতীয় বাজারে কেনার মানসিকতা নিয়ে প্রবেশ করবেন, তখন তাঁদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি পড়বে দেশের বড় বড় ব্যাঙ্কিং স্টকগুলির ওপরেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত কয়েক সপ্তাহে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাঁদের হাতে থাকা ব্যাঙ্কিং এবং আইটি সেক্টরের শেয়ারই সবচেয়ে বেশি বেচে দিয়েছেন। এই ব্যাপক বিক্রির চাপের ফলেই দেশের প্রথম সারির ব্যাঙ্কগুলির শেয়ার আজ অত্যন্ত সস্তা এবং আকর্ষণীয় দামে মিলছে।
বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বার্তা, এই বড় ব্যাঙ্কগুলির মৌলিক স্বাস্থ্যে (Fundamental health) বিন্দুমাত্র কোনো গলদ নেই। তাদের আর্থিক মূল্যায়ন দারুণ সস্তা, সম্পদের গুণমান (Asset quality) অত্যন্ত চমৎকার এবং মূলধনের প্রবৃদ্ধিও শক্তপোক্ত রয়েছে। শুধুমাত্র বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্যানিক সেলিং বা বিক্রির চাপের কারণেই এই স্টকগুলির দাম সাময়িকভাবে কমেছে। সুতরাং, যখনই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবার বাজারে ফিরে আসবেন, তখন ব্যাংকিং সেক্টরের হাত ধরেই সবচেয়ে শক্তিশালী তেজিভাব দেখা যাবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে একটু সাবধানে পা ফেলা এবং মার্কিন বন্ডের গতির ওপর নজর রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।