অতিরিক্ত মানসিক চাপই ডেকে আনছে নীরব মৃত্যু! হার্ট অ্যাংকের ঝুঁকি এড়াতে কোন মারাত্মক সত্যিটা জানা জরুরি?

হৃদরোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে এতদিন আমরা প্রধানত এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল, রক্তচাপ, রক্তের শর্করা বা ধূমপানের মতো পরিচিত বিষয়গুলির ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছি। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, শারীরিক এই সূচকগুলির পাশাপাশি মানসিক চাপও শরীরের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘস্থায়ী এবং অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাপ কেবল মনের ওপর প্রভাব ফেলে না, এটি কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদরোগের ক্ষেত্রে একটি সক্রিয় এবং বিপজ্জনক জৈবিক ঝুঁকি।

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কীভাবে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে?
শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে হঠাৎ কোনো বিপদে অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসল হরমোনের ক্ষরণ ঘটে। এর ফলে হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন দ্রুত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, যা বেঁচে থাকার এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন স্নায়ুতন্ত্র এই চাপ কমানোর বা রিল্যাক্স করার কোনো সঙ্কেত পায় না।

টাকা-পয়সার অভাব, কাজের অতিরিক্ত চাপ বা পারিবারিক অশান্তির কারণে যখন মানসিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তখন শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যায়। এই দীর্ঘমেয়াদী রাসায়নিক হাড়হিম করা প্রভাব ধমনীর ভিতরের সূচক কোষে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর ধরে ধমনীর দেওয়ালগুলি শক্ত হয়ে যায় এবং রক্ত চলাচলের পথ সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

হঠাৎ মানসিক ধাক্কা বা ‘ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম’:
তীব্র ও হঠাৎ কোনো মানসিক ধাক্কা বা শোকের ফলেও হৃদপিণ্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘তাকোৎসুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি’ (Takotsubo cardiomyopathy) বা ‘ভাঙা হৃদয় সিন্ড্রোম’ (Broken-heart syndrome) বলা হয়। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে হঠাৎ হরমোনের বিপুল প্লাবনের কারণে হার্টের প্রধান পাম্পিং চেম্বারটি সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে, যা বহু ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণকেই ফুটিয়ে তোলে।

দৈনন্দিন অভ্যাসেও বড় প্রভাব:
অবিরাম মানসিক চাপের কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও বিপর্যস্ত হয়। অতিরিক্ত চাপের মুখে থাকা ব্যক্তিরা প্রায়শই পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না, ব্যায়াম বন্ধ করে দেন, অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খান এবং মানসিক অবসাদ কাটাতে ধূমপান বা মদ্যপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসে আসক্ত হয়ে পড়েন। এই প্রতিটি বদঅভ্যাসই পরোক্ষভাবে হৃদযন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

হৃদরোগের ঝুঁকি এড়াতে করণীয়:
হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। গভীর শ্বাসপ্রশ্বাস বা প্রাণায়াম, নিয়মিত শারীরিক কসরত, কর্মক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমারেখা তৈরি করা এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়ার মতো সাধারণ পদক্ষেপগুলি শরীরের স্ট্রেস রেসপন্সকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। দীর্ঘমেয়াদী হৃদরোগের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে মানসিক চাপকে একটি গুরুতর শারীরিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করার সময় এখনই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *