আসছে শারদীয় নবরাত্রি ২০২৬! মহিষাসুর বধের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই গোপন তথ্যগুলো কি আপনার জানা আছে?

সনাতন ধর্মে শক্তি আরাধনার সবচেয়ে পবিত্র ও মহিমান্বিত উৎসব হলো শারদীয় নবরাত্রি। আগামী ১১ই অক্টোবর, ২০২৬ (রবিবার) থেকে দেশজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে চলেছে ২০২৬ সালের শারদীয় নবরাত্রি উৎসব। টানা নয় দিন ধরে দেবী দুর্গার নয়টি ভিন্ন শক্তির রূপের উপাসনা করেন কোটি কোটি ভক্ত।

তবে নবরাত্রি বললেই যার কথা সবার আগে মনে পড়ে, তা হলো অসুররাজ মহিষাসুর এবং মা দুর্গার সেই ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ। দুর্গাসপ্তশতী ও শাস্ত্রে ঠিক কী বলা হয়েছে এই যুদ্ধের সময়কাল ও মহিষাসুর নিপাত সম্পর্কে? আসুন জেনে নেওয়া যাক সেই পৌরাণিক রহস্য।

কে ছিলেন এই মহিষাসুর এবং কীভাবে পেয়েছিলেন অমরত্বের বর?

পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, মহিষাসুর ছিলেন এক অত্যন্ত পরাক্রমশালী অসুররাজ। ত্রিভুবন জয় করার উদ্দেশ্যে তিনি ভগবান ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করতে চরম ও কঠোর তপস্যা করেন। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা দেখা দিলে চতুর মহিষাসুর বর চান যে—কোনো দেবতা, দানব কিংবা পুরুষ যেন তাঁকে হত্যা করতে না পারে।

পুরুষের হাতে মৃত্যুর অমর বর পেয়ে অহংকারে অন্ধ হয়ে ওঠে মহিষাসুর। স্বর্গলোক আক্রমণ করে দেবরাজ ইন্দ্রকে বিতাড়িত করে এবং সাধারণ মানুষের ওপর শুরু করে চরম অত্যাচার। কোনো পুরুষ বা দেবতা তাঁকে পরাস্ত করতে না পেরে অবশেষে দেবতারা সম্মিলিত হন। ত্রিদেবের (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর) তেজ এবং সমস্ত দেবতার শক্তি একীভূত হয়ে আবির্ভূত হন মহামায়া দেবী দুর্গা।

মহিষ রূপ থেকে সিংহ: ছদ্মবেশী অসুরের সঙ্গে দেবীর রক্তক্ষয়ী সংঘাত

দেবী দুর্গাকে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখে নিজের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ছদ্মবেশী মহিষাসুর। কখনো বিশালাকার মহিষ, কখনো হিংস্র সিংহ, আবার কখনো তলোয়ারধারী পুরুষের রূপ ধরে দেবীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালায় সে। কিন্তু আদিশক্তির সামনে তার সব মায়াজাল ব্যর্থ হয়। দেবী দুর্গা তাঁর অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে মহিষাসুরের প্রতিটি রূপকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেন।

নবরাত্রির কোন দিনে ও কোন তিথিতে নিহত হয় মহিষাসুর?

ধর্মীয় শাস্ত্র ও পুরাণ মতে, মা দুর্গা ও মহিষাসুরের এই মহাসংগ্রাম চলেছিল টানা নয় দিন ও নয় রাত ধরে। অবশেষে নবরাত্রির দশম দিনে (আশ্বিন শুক্লা দশমী তিথিতে) দেবী দুর্গা তাঁর ত্রিশূল দিয়ে মহিষাসুরের বুক চিরে তাকে বধ করেন এবং স্বর্গ ও মর্ত্যকে স্বৈরাচারী অসুরের হাত থেকে রক্ষা করেন।

এই বিজয়ের স্মারকেই দশম দিনটিকে বিশ্বজুড়ে ‘বিজয়া দশমী’ বা ‘দশেরা’ হিসেবে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করা হয়। এর আগের তিথিগুলো, অর্থাৎ দুর্গাষষ্ঠী থেকে মহানবমী পর্যন্ত দেবী ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ রূপে পুজিত হন।

কেন আজও প্রাসঙ্গিক দেবী মাহাত্ম্য?

শাস্ত্র অনুসারে, মহিষাসুর কেবল এক রূপক অসুর নয়; সে ঔদ্ধত্য, অন্ধকার এবং অন্যায় শক্তির প্রতীক। আর দেবী দুর্গা হলেন সততা, সাহস ও ন্যায়ের চিরন্তন প্রতীক। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত ‘দুর্গা সপ্তশতী’ বা ‘দেবী মাহাত্ম্য’-এ দেবীর এই লড়াইয়ের মোট ৭০০টি শ্লোক এবং ১৩টি অধ্যায়ে বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। শারদীয় নবরাত্রিতে তাই অসুর বধের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অধর্ম ও অন্যায়ের শক্তি যত বড়ই হোক না কেন, চূড়ান্ত জয় সবসময় ধর্ম ও সত্যেরই হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *