“মেয়ের বুকের মাঝে দাগ থাকলে বিয়ে হবে না!” কুসংস্কারের চরম মাসুল, ১৬ বছর ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ল কিশোরী!

অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার এবং সামাজিক ‘লজ্জা’র ভয় কীভাবে একটি শিশুর প্রাণ সংশয়ের কারণ হতে পারে, তার এক ভয়াবহ অথচ চোখ খুলে দেওয়ার মতো ঘটনা সামনে এল কলকাতায়। মেয়ের বুকের মাঝখানে অস্ত্রোপচারের বড় দাগ থাকলে ভবিষ্যতে বিয়ে দিতে সমস্যা হতে পারে—এমনই অমূলক আশঙ্কায় দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ১৬ বছরের মেয়ের জরুরি হৃদরোগের চিকিৎসা করাননি বাবা-মা! অবশেষে কলকাতার একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাহসিকতা ও অভাবনীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের কৃপায় নতুন জীবন পেল সেই কিশোরী।
জন্মগত জটিল হৃদরোগ ও সামাজিক ভয়
মাত্র দুই মাস বয়সে প্রথম ওই কিশোরীর জন্মগত হৃদরোগ (Congenital Heart Disease) ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে বড় ধরণের ওপেন হার্ট সার্জারি প্রয়োজন। কিন্তু একদিকে আর্থিক অনটন, আর অন্যদিকে সমাজে ‘মেয়ের বুকে কাটা দাগ’ নিয়ে ওঠা সম্ভাব্য হাজার প্রশ্নের ভয়—এই দুইয়ের চাপে পিছিয়ে যান বাবা-মা।
বড় হওয়ার সাথে সাথে কিশোরীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। সামান্য হাঁটলেই তীব্র শ্বাসকষ্ট, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে ৬০-৬৫ শতাংশে নেমে এসেছিল (যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা ৯৫-১০০%)। সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলো বা সাধারণ খাবার খাওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল সে।
চিকিৎসকদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ ১৬ বছর পর যখন কিশোরীকে কলকাতার হাসপাতালে আনা হয়, তখন তার হৃদযন্ত্রের গঠনগত সমস্যা অত্যন্ত জটিল রূপ ধারণ করেছে। বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর কুন্তল রায় চৌধুরী এবং তাঁর মেডিক্যাল টিম পরীক্ষা করে দেখেন যে, সাধারণ পদ্ধতিতে হৃদযন্ত্রের ছিদ্র বন্ধ করা সম্ভব নয়। একমাত্র উপায় ছিল অত্যন্ত জটিল ‘ফনটান অপারেশন’ (Fontan Operation)।
সাধারণত ৮-১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই অপারেশন করা হয়। কিন্তু ১৬ বছর বয়সে অত্যন্ত কম অক্সিজেন স্যাচুরেশন নিয়ে এই সার্জারি করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তার ওপর পরিবার স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—তারা কোনওভাবেই বুকের মাঝখানে কাটা দাগ চান না!
চিকিৎসাবিজ্ঞানের নজিরবিহীন ‘হিডেন স্কার’ সাফল্য
চিকিৎসকরা মূল চিকিৎসায় কোনো আপোস না করেই পরিবারের এই সামাজিক সামাজিক দুশ্চিন্তাকে গুরুত্ব দেন। সাধারণত ফনটান অপারেশন বুকের মাঝখান দিয়ে কেটে করা হলেও, কলকাতার এই চিকিৎসক দল এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেন। প্রচলিত পথ এড়িয়ে, তারা বুকের পাশ দিয়ে (Side Thoracotomy) কেটে এই অত্যন্ত বিরল ও জটিল সার্জারি সম্পন্ন করেন, যাতে অস্ত্রোপচারের দাগ আড়ালেই থেকে যায়।
চিকিৎসক ডক্টর কুন্তল রায় চৌধুরী জানান, “জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ফনটান অপারেশন বুকের পাশ দিয়ে করার এমন নজির অত্যন্ত বিরল।”
অলৌকিক সুস্থতা ও চিকিৎসকদের বড় বার্তা
সমস্ত আশঙ্কা উ উড়িয়ে অস্ত্রোপচারের মাত্র ৭ দিনের মধ্যেই অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ওই কিশোরী। বর্তমানে সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে।
তবে এই ঘটনা থেকে সমাজ ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে চিকিৎসকদের স্পষ্ট বার্তা—সামাজিক কুসংস্কার বা ‘দাগে’র ভয়ে সন্তানের জীবনদায়ী চিকিৎসা আটকে রাখা চরম বিপজ্জনক। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং সামাজিক অন্ধ বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে সন্তানের প্রাণ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই প্রত্যেক অভিভাবকের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।