বাড়ির রান্নাঘরে মা ও পরিচারিকাকে নিয়ে শুরু! আজ দিনে বিক্রি ৩০ হাজার মোমো, তাক লাগাল কবীরের সাফল্যের গল্প

চাকরি ছেড়ে নিজের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া মুখের কথা নয়। আর হাতে যদি পুঁজি বলতে মাত্র ২ হাজার টাকা থাকে, তবে তো সেই ঝুঁকি নেওয়ার সাহস খুব কম মানুষেরই থাকে। কিন্তু সেই সামান্য সম্বলটুকুই সম্বল করে আজ তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কবীর সিং। মাত্র এক বছরের মধ্যে ৫৬ লক্ষ টাকার টার্নওভার তৈরি করে এক অনন্য নজির গড়েছেন তিনি। তাঁর এই স্টার্টআপের নাম ‘Oye! Momo’। ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন দিল্লির একাধিক ফুড ট্রাক, নামী রেস্তোরাঁ ও ক্লাউড কিচেনে মোমো সরবরাহ করে রীতিমতো সফলতার মুখ দেখেছে।
বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নভঙ্গ ও নতুন মোড়
কবীর সিং এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন যেখানে তিন প্রজন্ম ধরে খাবারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর নিজেরও বিদেশে সেটেল হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সেইমতো কানাডায় যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদনও করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। তবে কপালে ধাক্কা লাগতেই ভেঙে পড়েননি কবীর। বিদেশে যাওয়ার আশায় বসে না থেকে তিনি নিজের দেশেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন।
ব্যবসা শুরু করার আগে খাবারের বাজারে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই উদ্দেশ্যে জনপ্রিয় ফুড ব্র্যান্ড ‘Theka Coffee’-তে যোগ দেন কবীর। শার্ক ট্যাঙ্ক ইন্ডিয়াতে (Shark Tank India) নজর কাড়া এই সংস্থায় প্রায় চার বছর কাজ করে তিনি ব্যবসার অ আ ক খ শিখে নেন। দৈনন্দিন পরিচালনা থেকে শুরু করে কীভাবে একটি ব্র্যান্ডকে বড় করতে হয় এবং সঠিক সিস্টেম তৈরি করতে হয়—সবটাই তিনি কাছ থেকে রপ্ত করেন। বিশেষ করে ওই সংস্থার দ্রুত বৃদ্ধি দেখে কবীর বুঝতে পারেন, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে খাবারের ব্যবসায় বড় কিছু করা সম্ভব।
মাত্র ২ হাজার টাকা পুঁজি ও মোমোকেই বেছে নেওয়া
নিজের উদ্যোগ শুরু করার আগে কবীর বাজারে একটা বড় ফাঁক লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন, বিভিন্ন ফুড ভেন্ডর, ক্যাফে ও ক্লাউড কিচেন মোমো বিক্রি করলেও নিয়মিত ও ভালো মানের মোমো সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের অনেক সমস্যা পোহাতে হয়। এই সুযোগটিকেই লুফে নেন তিনি।
২০২৫ সালে দিল্লির দক্ষিণ অংশের একটি বাজারে ছোট্ট একটি টেবিল নিয়ে শুরু হয় ‘Oye! Momo’-র পথচলা। তাঁর ভাই একটি স্টিমার এনে দিয়েছিলেন, আর কাঁচামাল কেনার জন্য তাঁর প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২ হাজার টাকা। শুরুতে বাড়ির রান্নাঘরেই মোমো তৈরি করতেন তিনি। কাজে সাহায্য করতেন তাঁর মা এবং বাড়ির পরিচারিকা। কিন্তু খুব দ্রুত কবীর বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু একটি ছোট স্টল চালিয়ে বাজারে বড় জায়গা পাওয়া সম্ভব নয়। তখনই তিনি ব্যবসার মডেল আমূল বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন।
খুচরো বিক্রির বদলে বিটুবি (B2B) মডেলে বাজিমাত
নিজের দোকান খোলার ঝুঁকি না নিয়ে ‘Oye! Momo’-কে একটি বিটুবি সাপ্লায়ার ব্র্যান্ড (B2B supplier brand) হিসেবে গড়ে তোলেন কবীর। অর্থাৎ, বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, ফুড ট্রাক ও ক্লাউড কিচেনের জন্য তাজা মোমো তৈরি করে সরবরাহ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে ওই খাবারের দোকানগুলি প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে অর্ডার দেয়। এরপর রাতে উৎপাদনের কাজ শুরু হয় এবং সকাল ৮টার মধ্যে অর্ডার প্রস্তুত করে তা সরবরাহ করা হয়।
আজ প্রতিদিন তৈরি হয় ৩০ হাজার মোমো
মাত্র ২ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা সেই ব্যবসা আজ প্রকাণ্ড আকার নিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ‘Oye! Momo’ এখন প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার মোমো তৈরি করে। শুধু পাইকারি সরবরাহ নয়, ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকদের কাছেও মোমো পৌঁছে দিচ্ছে তারা। ছোট একটি টেবিল ও বাড়ির রান্নাঘর থেকে শুরু হওয়া এই ব্যবসা মাত্র এক বছরের মাথাতেই ৫৬ লক্ষ টাকার টার্নওভারে পৌঁছে গিয়েছে।
কবীরের এই জার্নি প্রমাণ করে যে, জীবনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও যদি সঠিক সময়ে সঠিক স্ট্র্যাটেজি নেওয়া যায়, তবে অল্প পুঁজি দিয়েও বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।