‘সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত না হলে স্থগিত হতে পারে!’ জ্ঞানেশ কুমার মামলায় সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণে শোরগোল

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে চলা মামলার শুনানিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, নির্বাচন কমিশনের কোনো সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মতভাবে না নেওয়া হয়, তবে তা স্থগিত রাখা হতে পারে। সংবিধান সংশোধন করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে যে বেনজির ক্ষমতা ও আইনি রক্ষাকবচ (Immunity) দেওয়া হয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় এদিন নোটিস ইস্যু করেছে শীর্ষ আদালত। তবে একই সঙ্গে, মামলাকারীদের আর্জি সত্ত্বেও জ্ঞানেশ কুমারকে এই মুহূর্তে সাসপেন্ড করার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দিতে অস্বীকার করেছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।

সুপ্রিম কোর্টে কী নিয়ে চলছে লড়াই?
গতকাল সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সাসপেনশনের দাবিতে মামলার শুনানি হয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার বিশেষ বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলে। মামলাকারীদের মূল অভিযোগ, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারের কোনো রকম সম্মতি ছাড়াই নির্বাচনী প্রক্রিয়া সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছেন।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) এবং ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন আনার বিষয়টি আদালতে জোরালোভাবে তুলে ধরেন আইনজীবীরা। মামলাকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিং জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে সাসপেন্ড করার দাবি জানিয়ে বলেন, তাঁর এই ধরনের একতরফা কাজকর্ম দেশের গণতান্ত্রিক মূল কাঠামোকেই বিপন্ন করে তুলছে। এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের তদন্তমূলক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে জানানো হয় যে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের একাধিক একক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাকি দুই কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী—মোট ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে আইনজীবী বিকাশ সিং জানান যে, ওই অভিযোগগুলি নির্বাচন কমিশন তাদের কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অস্বীকারও করেনি। এরপর বেঞ্চ জানায়, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব বক্তব্য শোনা হবে এবং সিদ্ধান্তগুলি আদতে সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছিল নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে—তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

যদিও অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হিসেবে জ্ঞানেশ কুমারকে তাৎক্ষণিকভাবে সাসপেন্ড করার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে আদালত। তবে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন, জ্ঞানেশ কুমার এবং বাকি দুই কমিশনারকে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিস পাঠানো হয়েছে।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ক্ষমতা ও আইনি রক্ষাকবচ কী?
ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের নির্বাচন পরিচালনা, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের হাতে ব্যাপক প্রশাসনিক ও আইনি ক্ষমতা রয়েছে। ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধন, এসআইআর প্রক্রিয়া পরিচালনা থেকে শুরু করে নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া বা আধিকারিকদের বদলি করার একচ্ছত্র ক্ষমতা তাঁর রয়েছে।

তবে এই পদের আইনি সুরক্ষা ও অপসারণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতা ছাড়া তাঁকে সহজে পদ থেকে সরানো যায় না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির অপসারণের মতোই সংসদের উভয় কক্ষে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাশ হলেই একমাত্র তাঁকে অপসারণ করা সম্ভব। তবে আইনি রক্ষাকবচ থাকলেও তাঁর সমস্ত একচ্ছত্র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে সুপ্রিম কোর্টে আইনি চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে, সাম্প্রতিক এই মামলাটি তারই এক স্পষ্ট প্রমাণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *