‘সুইসাইড নোট’ নাম কেন? তসলিমার নতুন বই প্রকাশ পেতেই শোরগোল সাহিত্য মহলে!

২৩ বছর আগে তাঁর বহুচর্চিত উপন্যাস ‘দ্বিখণ্ডিত’ পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বিতর্ক সেখানে থামেনি—তার ঠিক চার বছর পরে রাতারাতি রাজ্য ছাড়তেও বাধ্য হয়েছিলেন বিশিষ্ট লেখিকা তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘ ১৯ বছরের সুদীর্ঘ ‘নির্বাসন’ পর্ব কাটিয়ে এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সম্প্রতি তিনি ঘুরে গিয়েছেন তাঁর প্রিয় বাংলায়। এমনকি আগামী বছরের শুরুতে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলাতেও তাঁর উপস্থিত থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এই আসা-যাওয়ার আবহের মাঝেই এবার এ রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলো তসলিমার নতুন বই ‘সুইসাইড নোট এবং অন্যান্য গল্প’।

গত জুলাই মাসে তসলিমার প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর আত্মজীবনী সমগ্রের একটি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়ে লেখিকা জোরালো বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, “কোনও লেখকের মত পছন্দ না হলে পাল্টা বই লিখুন। তাঁকে হত্যা বা কারারুদ্ধ করবেন না।” এরপর দীর্ঘ বিরতির পর এই প্রথমবার এ রাজ্যে তসলিমার কোনো নতুন বই আত্মপ্রকাশ করল। মোট ১৫টি গল্পের সংকলন নিয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর বইটি প্রকাশ করেছে হুগলির চুঁচুড়ার নামী প্রকাশনা সংস্থা ‘এবং অধ্যায়’। বইটির শিরোনাম গল্প ‘সুইসাইড নোট’-এ মূলত ফুটিয়ে তোলা হয়েছে স্ত্রীর উদ্দেশে এক স্বামীর লেখা শেষ চিঠির মর্মান্তিক পটভূমি। এছাড়া বাকি প্রায় সমস্ত গল্পের মূল ভাবনা আবর্তিত হয়েছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খলে বন্দি নারীদের জীবনের বিভিন্ন দিককে কেন্দ্র করে।

নামকরণের নেপথ্য রহস্য ও প্রকাশকের ভাবনা

তসলিমা এই সময় অনলাইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই বইটির নামকরণ তিনি নিজে করেননি। বইটির নামকরণ করেছেন প্রকাশক ধীমান ব্রহ্মচারী নিজেই। লেখিকার কথায়, “বইটার নাম ‘সুইসাইড নোট এবং অন্যান্য’, আমি এভাবে দিতে চাইনি। আমি বলেছিলাম ‘১৫টা জানলা’ বা এই ধরনের কিছু একটা নাম দিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নামটি ওঁর (প্রকাশকের) দেওয়া। আমার মনে হয়, উনি একটা ক্যাচি নাম দিতে চেয়েছেন। পরে বুঝেছি, হয়তো পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই এই নামকরণ।”

অন্যদিকে প্রকাশক ধীমান ব্রহ্মচারী জানিয়েছেন, সাহিত্যে যেকোনো বইয়ের নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বইটির শুরুতে অন্য একটি নাম ঠিক করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তসলিমার পাণ্ডুলিপি পড়ার পর তাঁর মাথায় এই নতুন নামটি আসে এবং দিদিকে সেই প্রস্তাব দেওয়া মাত্রই তিনি তাতে সম্মতি দেন।

বই প্রকাশের সঙ্গে কি প্রত্যাবর্তনের কোনো যোগসূত্র আছে?

লেখিকার সাম্প্রতিক কলকাতা প্রত্যাবর্তন এবং এই বই প্রকাশের মধ্যে কোনো অদৃশ্য ব্যবসায়িক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে প্রকাশক ধীমান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এর নেপথ্যে আলাদা করে কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা বিশেষ সমীকরণ নেই। তা ছাড়া তাঁদের লিটল ম্যাগাজিনের শারদ সংখ্যাতেও অতীতে তসলিমার লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশকের কথায়, “অনেকের মনে হতেই পারে যে, তসলিমাদি ফিরলেন আর আমরা এই সময়ে বই প্রকাশ করলাম। আলোচনার জোয়ারে বই বিক্রির চেষ্টা বলে মনে হতেই পারে। তবে দিদির লেখা আমরা আগেও ছেপেছি।”

তসলিমা নিজেও জানিয়েছেন যে, প্রথমে এই গল্প সংকলন প্রকাশের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। পরে ম্যাগাজিনের জন্য তিনি লেখা পাঠানোর পরেই প্রকাশক নতুন বই প্রকাশের কথা ভাবেন। লেখিকার ভাষায়, “ম্যাগাজিনের জন্য অনেকেই লেখা চান। উনিও চাইতেন। সবাইকে তো আর লেখা পাঠানো সম্ভব হয় না। চোখে পড়লে পাঠিয়ে দিই। ওঁর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। উনি অনেক অনুরোধ করেছিলেন। আমি ভাবলাম, গল্প তো অনেক আছে, দিয়েই দিই। তার পরেই উনি বললেন, আরও কয়েকটা গল্প দিলে একটা বইয়ের মতো কিছু করা যায়। তখনই জানতাম যে, উনি পাবলিশার। আমার পুরোনো গল্পগুলো চেয়েwanted, আমিও ১৫টা গল্প দিলাম।”

প্রকাশকের দীর্ঘ জার্নি ও তসলিমার সঙ্গে সংযোগ

ধীমান আদতে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বাসিন্দা। উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর তাঁর ঠিকানা বদলায় এবং তিনি চুঁচুড়ায় এসে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোন। স্নাতকোত্তর পাশের পর চার বছর সাংবাদিকতাও করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে বইপাড়ার দুনিয়ায় প্রবেশ করে গড়ে তোলেন নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা ‘এবং অধ্যায়’।

স্মৃতিচারণা করে ধীমান জানান, ২০০৭ সালে যখন তিনি কলেজে পড়তেন এবং অর্থাভাবে একটি কারখানায় কাজ করতেন, সেই সময়েই হঠাৎ কারখানার মালিক নোটিশ টাঙিয়ে জানিয়ে দেন যে বিকেল ৫টায় কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শহর কলকাতা তখন রাজনৈতিক উত্তেজনায় টালমাটাল, চারদিকে পুলিশি টহলদারি ও চরম আতঙ্কের পরিবেশ। ঠিক সেই turbulent সময়েই তিনি তসলিমার শহর ছাড়ার খবর পেয়েছিলেন। আর আজ, প্রায় কুড়ি বছর পর সেই একই লেখকের বই তাঁরই প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হওয়া এক আবেগঘন মুহূর্ত। ধীমানের স্পষ্ট বক্তব্য, “একজন শিল্পী বা একজন লেখকের বাকস্বাধীনতা থাকতেই হবে। এই বই নিয়ে কেউ সমালোচনা করতেই পারেন। যদি তা হয়, বুঝব মানুষ বই পড়ছে।”

আগামী বইমেলায় কি থাকছেন তসলিমা?

ধীমানের ‘এবং অধ্যায়’ প্রকাশনা থেকে এর আগেও পবিত্র সরকার, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, সৌমিত্র বসু, অনিতা অগ্নিহোত্রী, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম বসু মল্লিক, তৃষ্ণা বসাক, অংশুমান কর, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, রাহুল দাশগুপ্ত এবং নীলাঞ্জন হাজরার মতো প্রথিতযশা বহু কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকের বই প্রকাশিত হয়েছে। সেই সুদীর্ঘ তালিকায় এবার যুক্ত হলো তসলিমা নাসরিনের নাম।

আসন্ন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় স্বয়ং লেখিকাকে দিয়েই কি এই নতুন বইটির উন্মোচন করানোর কোনো পরিকল্পনা রয়েছে? প্রকাশক জানিয়েছেন, তাঁর তীব্র ইচ্ছে থাকলেও সবকিছুই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে সার্বিক পরিস্থিতির ওপর। তবে তসলিমা নিজে নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি আগামী বইমেলায় থাকবেন এবং মেলার পুরো সময় জুড়েই কলকাতায় কাটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। লেখিকার কথায়, “বইমেলা শুরু হওয়ার অনেক আগেই কলকাতায় যাব। পরেও থাকব। এক মাস থেকে দেড় মাস শহরে থাকার ইচ্ছে আছে আমার।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *