মৃত্যুদণ্ড আটকাতে এ কোন নতুন খাবার বানিয়েছিলেন রাঁধুনির স্ত্রী? জানলে অবাক হবেন সিঙারার এই রাজকীয় ইতিহাস

বিকেলের চায়ের কাপের সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা মুচমুচে সিঙারায় কামড় না বসালে বাঙালির আড্ডাই যেন জমে না। কিন্তু আপনি কি জানেন, সুস্বাদু এই ত্রিভুজাকার ভাজা পদটির জন্ম কীভাবে হয়েছিল? সিঙারার ইতিহাস নিয়ে বাংলার বুকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ঘিরে এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর লোককথা প্রচলিত রয়েছে, যা শুনলে চমকে উঠবেন যে কেউ।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাগের খাপ্পা হওয়া ও রানির কায়দা
প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মিষ্টি খাওয়া অনেক আগেই নিষিদ্ধ করেছিলেন রাজবৈদ্যরা। একদিন সকালে রাজসভায় প্রাতরাশ করার সময় ঠান্ডা লুচি মুখে দিয়ে বেজায় মেজাজ হারান মহারাজা। রাগের চোটে তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রধান হালুইকরকে চরম শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন।

স্বামীর এমন বিপদ দেখে তাঁর প্রাণ বাঁচাতে আসরে নামেন হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহরা। তিনি সোজা রাজদরবারে হাজির হয়ে রাজাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি এমন একটি সুস্বাদু খাবার বানিয়ে দেবেন যা অনেকক্ষণ পর্যন্ত গরম থাকবে। তবে মহারাজও শর্ত দেন যে, যখনই তিনি চাইবেন, ঠিক তখনই সেই খাবার তাঁকে গরম গরম পরিবেশন করতে হবে।

কীভাবে তৈরি হয়েছিল প্রথম ‘সিঙারা’?
প্রতিশ্রুতি মতো সোজা রাজপ্রাসাদের রান্নাঘরে ঢুকে পড়েন ধরিত্রী দেবী। তিনি ছোট ছোট লুচি বেলে তার ভেতরে সুস্বাদু সব তরকারির পুর ভরে দেন নিপুণ হাতে। এরপর সেই পুরভরা ময়দার তালকে একটা সুন্দর ত্রিভুজের আকার দিয়ে গরম ঘিয়ে সোনালি ও মুচমুচে করে ভেজে নেন।

খাবারটি এতটাই গরম ছিল যে একবারে মুখে দিলে জিভ পুড়ে যাওয়ার ভয় ছিল। ধরিত্রী দেবী রাজাকে সাবধান করে বলেন, একবারে নয়, বরং ছোট একটা কামড় বসাতে হবে। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র সাবধানে কামড় বসাতেই দীর্ঘ ছ’মাস পর তাঁর মুখের খরা কেটে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। এই সুস্বাদু স্বাদে খুশি হয়ে মহারাজা ধরিত্রী দেবীকে তিন ছড়া মুক্তোর মালা উপহার দেন। গল্প অনুসারে, ধরিত্রী দেবী এই নতুন মুখরোচক খাবারের নাম দিয়েছিলেন ‘সমভুজা’, যা সমান তিনটি ভুজ বা দিককে নির্দেশ করে। অনেকের মতেই, এই ‘সমভুজা’ই কালক্রমে আজকের জনপ্রিয় ‘সিঙারা’য় রূপ নিয়েছে।

আসল ইতিহাস কী বলছে?
লোককথার এই গল্পটি শুনতে যতই রোমাঞ্চকর হোক না কেন, ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে অন্য তথ্য উঠে আসে। গবেষকদের মতে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বহু শতক আগেই ভারতে সিঙারা বা সমোসার আগমন ঘটেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের ‘সাম্বুসাক’ বা ‘সংবোসাগ’ থেকেই এই ত্রিভুজাকার ভাজা খাবারের আসল উৎপত্তি। এমনকি চতুর্দশ শতকে বিখ্যাত পর্যটক ইবন বতুতার লেখাতেও দিল্লির সুলতানি দরবারে মাংস ও বাদামের পুর দেওয়া সমোসা খাওয়ার ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা এদেশে আলু নিয়ে আসার পরই সিঙারার অন্দরে আলুর প্রবেশ ঘটে। ফলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং ধরিত্রী দেবীর গল্পটি মূলত বাংলায় আলুর পুর দেওয়া নিরামিষ সিঙারাকে জনপ্রিয় করে তোলার একটি দারুণ স্থানীয় মিথ বা লোকগাথা। সত্যি আর মিথের এই অদ্ভুত মিশ্রণেই বাঙালির সিঙারা আজ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। আজ বিকেলে চা খাওয়ার সময় এই রাজকীয় ইতিহাস মনে পড়লে আড্ডার মেজাজ যে দ্বিগুণ হবে, তা বলাই বাহুল্য!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *