মাঝআকাশে মৃত্যুর মুখোমুখি! অবিকল নীরজা ভানোটের মতো এভাবেই ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছার

সহজ কথায় বলতে গেলে, পরিস্থিতি যখন চরম কঠিন হয়ে পড়ে, ঠিক সেই মুহূর্তেই বীরদের আসল রূপ বেরিয়ে আসে। সময়ের নিরিখে মাঝখানে কেটে গেছে দীর্ঘ চল্লিশটি বছর। কিন্তু আজকের ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছারের সাহসিকতার সঙ্গে একসুতোয় যেন জুড়ে গিয়েছেন আশির দশকের সেই চিরস্মরণীয় নাম—নীরজা ভানোট। স্মিত পেশায় ক্যাপ্টেন আর নীরজা ছিলেন ক্রু, কিন্তু দুজনের মানসিকতা ও মূল চেতনাটি পুরোপুরি এক। বিমানে যখন চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল, তখন নিজেদের সুরক্ষার কথা না ভেবে নীরজা জীবন দিয়ে ইতিহাস লিখেছিলেন। আর অন্যদিকে, স্মিত মারাত্মক জখম হয়েও এক অলৌকিক বীরত্বে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। বিশ্ব এভিয়েশনের ইতিহাসে এই দুটি নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

নিজের ২৩তম জন্মদিনের ঠিক দু’দিন আগে প্রাণ দিয়েছিলেন নীরজা। আর আজ স্মিতের দ্রুত আরোগ্য কামনায় প্রহর গুনছে গোটা দেশ। বুধবার ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছারের জন্য সোমনাথ মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছে গুজরাত। শুধু তাই নয়, তাঁর এই অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ সম্মানে ভূষিত করতে চলেছে গুজরাত সরকারও।

১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব চিনেছিল নীরজা ভানোটকে আজ থেকে ঠিক চার দশক আগে, ১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩-এর সিনিয়র ফ্লাইট পার্সার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মাত্র বাইশ বছরের তরুণী নীরজা ভানোট। মুম্বই থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট হয়ে নিউ ইয়র্কগামী বোয়িং ৭৪৭ বিমানটি পাকিস্তানের করাচি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর চারজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী সেটিকে হাইজ্যাক করে।

বিপদের প্রথম সঙ্কেত পেয়েই নীরজা দ্রুত কোডের মাধ্যমে ককপিট ক্রুদের হাইজ্যাকের খবর দেন। এর ফলে বিমানের পাইলটেরা ককপিটের ইমার্জেন্সি হ্যাচ দিয়ে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। পাইলট না থাকায় সন্ত্রাসীরা বিমানটিকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারেনি, যা বিমানের সাড়ে তিনশো যাত্রীর জীবন রক্ষায় মূল চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। এরপর দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টা ধরে পুরো বিমান ও যাত্রীদের সুরক্ষার একক দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। যাত্রীদের বাঁচাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন উৎসর্গ করেন নীরজা। ১৯৮৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন বীরত্ব পুরস্কার ‘অশোক চক্র’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। তিনি হয়েছিলেন এই পুরস্কার প্রাপ্ত সর্বকনিষ্ঠ ও প্রথম মহিলা।

২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর: স্মিত মচ্ছারের ককপিটের রক্তক্ষয়ী লড়াই নীরজার ঘটনার ঠিক চার দশক পর, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাই এফজেড১০৭৩ বিমানে অবিকল তেমনই এক নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছার। তবে এবারের আক্রমণকারী বাইরের কেউ ছিল না, ককপিটের ভেতরে থাকা কো-পাইলটই বিমানে থাকা ধারাল অস্ত্র দিয়ে হঠা়ৎ পাইলটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বিমানটিকে ক্র্যাশ করানোর চেষ্টা করেন।

হাজার হাজার ফুট নীচে নেমে আসা বিমানের ভেতরে শরীর রক্তে ভেসে যাওয়া সত্ত্বেও একমুহূর্তের জন্যও হার মানেননি স্মিত। মারাত্মক জখম অবস্থায় নিজের হাতে ককপিটের ডিজিটাল লক খুলে দেন তিনি। এর ফলে কেবিন ক্রু ও অন্য যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে আক্রমণকারীকে নিবৃত্ত করতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত অফ-ডিউটি দুই পাইলটের সহযোগিতায় বিমানটিকে সৌদির তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে নামিয়ে আনা হয়। ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়ে স্মিত এখন চিকিৎসাধীন। তাঁর এই সাহসিকতা আজ গোটা দেশের বুকে নতুন করে বীরত্বের ইতিহাস লিখে ফেলল।

Pratik Saha
  • Pratik Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *