আলোর জাদুকর দীনেশ পোদ্দারের মুকুটে জাতীয় পালক, রাষ্ট্রপতি ভবনের স্বীকৃতি পেলেন বাংলার কৃতি সন্তান!

তাঁকে ‘আলোর জাদুকর’ বললে বোধহয় ভুল বলা হবে না। মঞ্চের আলো থেকে প্রেক্ষাগৃহ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা কলকাতার দুর্গাপুজোর মণ্ডপ— আলোর পরিকল্পনায় দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে চলেছেন দীনেশ কুমার পোদ্দার। তাঁর সেই দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি মিলল জাতীয় স্তরে। ‘অ্যালায়েড থিয়েটার আর্টস-লাইটিং’ বিভাগে ২০২৪ সালের মর্যাদাপূর্ণ ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমি’ পুরস্কার পেলেন এই বিশিষ্ট আলোক-পরিকল্পক। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে পুরস্কারের মানপত্র গ্রহণ করেন তিনি।
পূর্ব ভারতের অন্যতম পরিচিত এই আলোক-পরিকল্পকের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল থিয়েটারের অভিনেতা হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি মঞ্চসজ্জার কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে মঞ্চের আলোকসজ্জার প্রতি বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয় এবং সেখানেই নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। থিয়েটার, শাস্ত্রীয় ও সমসাময়িক নৃত্য এবং সঙ্গীত— বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর আলোক পরিকল্পনা দারুণ প্রশংসিত হয়েছে।
জাতীয় স্তরের এই সম্মান পাওয়ার পর দীনেশ কুমার পোদ্দার বলেন, “আমি খুবই গর্বিত। আলোর পথ ধরে আলোকিত আমার পথ চলা। আজ সেই পথ ধরেই এমন স্বীকৃতি, যা আগামী দিনের পথ চলার জন্য আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করল। আমি সঙ্গীত নাটক আকাদেমির কাছে কৃতজ্ঞ।”
জাতীয় স্তরের এই সম্মানের পাশাপাশি তাঁর ঝুলিতে রয়েছে আরও বহু পুরস্কার। ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘সেরা আলোক-পরিকল্পক’ পুরস্কার, ২০১৩ সালে ‘এক্সেলেন্স ইন স্টেজ লাইট ডিজাইনিং’ ও ‘ভারত নির্মাণ পুরস্কার’, ২০১৪, ২০১৬ ও ২০১৮ সালে তিনবার ‘উষা উত্থুপস স্টেজ ক্রাফট অ্যাওয়ার্ডস’, ২০১৭ সালে ‘ইমা স্পটলাইট অ্যাওয়ার্ড’ এবং ১৯৯৮ সালে ‘আউটস্ট্যান্ডিং ইয়াং পার্সন অফ ক্যালকাটা’ সহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
দেশের বহু খ্যাতনামা শিল্পী ও পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। নৃত্যের ক্ষেত্রে পণ্ডিত বিরজু মহারাজ, গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র, বিদুষী সংযুক্তা পাণিগ্রাহী, মল্লিকা সারাভাই, তনুশ্রী শঙ্কর, গীতা চন্দ্রন, ইলা অরুণ, আস্তাদ দেবু, লুনা পোদ্দার ও শাশ্বতী সেনের মতো শিল্পীদের প্রযোজনায় আলোক পরিকল্পনার দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।
সঙ্গীত জগতেও ওস্তাদ জাকির হোসেন, ওস্তাদ আমজাদ আলি খান, পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, শঙ্কর মহাদেবন, পণ্ডিত বিশ্বমোহন ভাট, নুসরত ফতেহ আলি খান, নীলাদ্রি কুমার ও অনুষ্কা শঙ্করের মতো প্রথিতযশা শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন দীনেশ। নাটকের ক্ষেত্রে শ্যামানন্দ জালান, ব্রাত্য বসু এবং সুমন মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকদের প্রযোজনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর কাজ পৌঁছে গিয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, পোল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, কাতার, স্কটল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, তাজিকিস্তান এবং পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিদেশ সফর করেছেন তিনি। এর মধ্যে একাধিক কাজ ছিল আইসিসিআর-এর উদ্যোগে আয়োজিত। এছাড়া রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে আয়োজিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও তাঁর আলোক পরিকল্পনা ব্যবহৃত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ভবনেও প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর কাজ।
শুধু মঞ্চ বা বড় অনুষ্ঠান নয়, নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার কাজেও যুক্ত তিনি। ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’, ‘ইজেডসিসি’ এবং ‘রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’-এর মতো প্রতিষ্ঠানে আলোকসজ্জা নিয়ে ব্যবহারিক কর্মশালা পরিচালনা করেছেন দীনেশ। পাশাপাশি ব্রিটিশ কাউন্সিল ও মার্কিন কনস্যুলেট-সহ কলকাতার বিভিন্ন বিদেশি কনস্যুলেটকে কারিগরি সহায়তা দিয়েছেন।
সবশেষে বলা যায়, শুধু প্রথাগত মঞ্চই নয়, কলকাতার দুর্গাপুজোর মণ্ডপেও তাঁর আলোক পরিকল্পনা বিশেষভাবে পরিচিত। শহরের একাধিক পুজোমণ্ডপে তাঁর নান্দনিক আলোকসজ্জা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, যার মধ্যে বেশ কিছু কাজ সেরার পুরস্কারও অর্জন করেছে।