খুদে টিলা না আস্ত পর্বত? আরাবল্লীর ভুল সংজ্ঞা ঘিরেই বিরাট বিতর্ক, কড়া নির্দেশ দেশের শীর্ষ আদালতের

আইনি মারপ্যাঁচ এবং পরিবেশগত তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ভঙ্গিল পর্বতমালা— আরাবল্লী। গত বছরের নভেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিতর্ক বর্তমানে এক জটিল মোড় নিয়েছে। পাহাড়ের উচ্চতা নির্ধারণ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার বেড়াজালে এই প্রাচীন ভূ-প্রকৃতির অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হওয়ায় আসরে নামতে হয়েছে দেশের শীর্ষ আদালতকে। পরিবেশবিদ ও স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে এবার এক উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনার কড়া নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

আরাবল্লীর সংজ্ঞা নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

মূল ঝামেলার সূত্রপাত হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশকে কেন্দ্র করে। সেই রায়ে বলা হয়েছিল, প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী ভূমিস্তর থেকে ১০০ মিটার বা তার বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট এবং পরস্পর থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত পাহাড়গুলিই কেবল ‘আরাবল্লী পর্বতশ্রেণি’র অংশ বলে গণ্য হবে।

এই সংজ্ঞার জেরে ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী এক বিপজ্জনক চিত্র সামনে এসেছে:

  • ছোট পাহাড়গুলির বাদ পড়া: রাজস্থানের ১২ হাজার ৮১টি পাহাড়ের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৪৮টি বা ৮.৭ শতাংশ পাহাড় ১০০ মিটার উচ্চতার মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে।

  • খননকার্যের অবাধ ছাড়পত্র: সমালোচকদের দাবি, এই সংকীর্ণ সংজ্ঞার কারণে ৯০ শতাংশের বেশি পাহাড়ের অংশবিশেষ আইনের আওতার বাইরে চলে যাবে, যা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে চুনাপাথর উত্তোলন এবং পাথর ভাঙার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পথ প্রশস্ত করবে।

  • পরিবেশের ওপর আঘাত: এর ফলে স্থানীয় এলাকায় জলস্তর নেমে যাওয়া, তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগ এবং জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ ও নতুন ডেডলাইন

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আগের রায়ে স্থগিতাদেশ জারি করে। একই সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ ফরেস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (ICFRE)-এর ডিরেক্টর কাঞ্চন দেবীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সর্বোচ্চ আদালত প্যানেলটিকে নির্দেশ দিয়েছে যে, শুধুমাত্র ১০০ মিটারের নির্দিষ্ট উচ্চতার ওপর নির্ভর না করে ভূতাত্ত্বিক, হাইড্রোলজিক্যাল এবং পরিবেশগত সমস্ত মাপকাঠি বিচার করে চূড়ান্ত মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, কমিটির রিপোর্ট পেশের সময়সীমা কমিয়ে চলতি বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তা জমা দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পর্যালোচনার মূল বিষয়সমূহ গুরুত্ব ও লক্ষ্য
একক বাস্তুতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি পর্বতমালাকে বিচ্ছিন্ন টিলার বদলে একটি অবিচ্ছিন্ন বাস্তুতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে দেখা।
বাফার জোন সুরক্ষা ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনর্ভরণ অঞ্চল ও বন্যপ্রাণী করিডোর চিহ্নিত করে সুরক্ষিত করা।
স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ আদিবাসী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে স্বচ্ছ আলোচনার প্রক্রিয়া বজায় রাখা।

কেন এই পাহাড় রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি?

আরাবল্লী পর্বতমালা কেবল কিছু পাথরের সমষ্টি নয়; এটি থর মরুভূমির পূর্বমুখী বিস্তার রোধে এক দুর্ভেদ্য পরিবেশগত প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। রাজস্থান, হরিয়ানা, দিল্লি ও গুজরাতজুড়ে কৃষি ও পানীয় জলের জোগান টিকিয়ে রাখতে এই পর্বতশ্রেণি ভূগর্ভস্থ জলস্তর (অ্যাকুইফার) পুনর্ভরণে বিরাট ভূমিকা পালন করে।

বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, একটি ত্রুটিপূর্ণ ও দূরদৃষ্টিহীন সংজ্ঞার দোহাই দিয়ে এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া শুধু পরিবেশ নীতির ব্যর্থতাই নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক মারাত্মক অবিচার। এখন দেখার বিষয়, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এই কমিটি তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেমন বিজ্ঞানসম্মত ও জনমুখী রিপোর্ট পেশ করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *