ভারতকে বাদ দিয়েই বঙ্গোপসাগরে নতুন ‘মাস্টারপ্ল্যান’? চিন-বাংলাদেশ করিডর নিয়ে দিল্লি কেন চিন্তিত?

বাংলাদেশ ও চিনের মধ্যে প্রস্তাবিত নতুন একটি অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত এই সংযোগ ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ-চিন-মায়ানমার ইকোনমিক করিডর’ (BCMEC)। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংকে মায়ানমারের মাধ্যমে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এই বৃহত্তর বাণিজ্যিক ও পরিকাঠামোগত নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে চিনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেই এই ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডর কার্যকর করা নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া মংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ, চিনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি, শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয় উঠে আসে।

করিডরের সম্ভাব্য রুট ও ভৌগোলিক গুরুত্ব

এই পরিকল্পনার অধীনে চিনের কুনমিং থেকে শুরু করে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিবহণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে পণ্য বাংলাদেশে পৌঁছাবে। পরবর্তীতে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপথ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

তবে মায়ানমারের ঠিক কোন সীমান্ত, সড়ক বা রেলপথ দিয়ে এই নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, কুনমিং থেকে মায়ানমারের মান্দালয় হয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত একটি প্রাথমিক ব্লু-প্রিন্ট নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে। মায়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর এই রুটের চূড়ান্ত রূপরেখা অনেকটাই নির্ভর করছে।

আগের BCIM থেকে এটি কোথায় আলাদা?

পূর্বে ভারত, বাংলাদেশ, চিন ও মায়ানমার—এই চার দেশকে নিয়ে ‘বিসিআইএম’ (BCIM) করিডরের একটি পরিকল্পনা ছিল। সেই প্রস্তাবে চিনের ইউনান থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনায় যে কাঠামোটি সামনে আসছে, সেখানে ভারত নেই। অর্থাৎ, ভারতকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে চিন ও মায়ানমারের মধ্য দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনই এখন বেজিংয়ের প্রাথমিক লক্ষ্য।

চিনের জন্য কৌশলগত কেন গুরুত্বপূর্ণ?

চিনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশটি মূল সমুদ্র উপকূল থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। মায়ানমার ও বাংলাদেশকে ঢাল করে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার পেলে চিন ভারত মহাসাগরের দিকে একটি নতুন ও সংক্ষিপ্ত বাণিজ্য পথ পাবে।

বর্তমানে চিনের আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের বড় একটি অংশ দক্ষিণ চিন সাগর ও স্পর্শকাতর মালাক্কা প্রণালী হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। কোনো কারণে এই বাণিজ্যিক রুট বাধাগ্রস্ত হলে চিনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই মায়ানমার ও বাংলাদেশের বন্দরকে যুক্ত করে তৈরি বিকল্প স্থল ও সমুদ্রপথ বেজিংয়ের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত সুবিধাজনক।

বঙ্গোপসাগরে চিনের উপস্থিতি ও ভারতের নজর

বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চিনের প্রভাব বৃদ্ধি একদম নতুন কোনো ঘটনা নয়। মায়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্র বন্দর এবং চিন-মায়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (CMEC) নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ চলছে। তবে নতুন BCMEC করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বন্দরগুলোও এই আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে সরাসরি যুক্ত হয়ে যাবে, যা বঙ্গোপসাগরে চিনের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উপস্থিতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রস্তাবিত করিডরটি ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের একেবারেই কাছাকাছি অবস্থিত। বাংলাদেশে চিনা বিনিয়োগ, বন্দর নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকাঠামো উন্নয়ন বৃদ্ধি পেলে ঢাকার ওপর বেজিংয়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়বে। নয়াদিল্লির উদ্বেগের মূল কারণ হলো—নিজের পেছনের উঠোনে চিনের এই ধারাবাহিক প্রভাব বিস্তার।

তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রকল্পটিকে এখনই সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও অর্থায়নের জটিলতা এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ। তা সত্ত্বেও, নিজ সীমানার কাছে বেজিংয়ের এমন অর্থনৈতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে নয়াদিল্লি যে সতর্ক অবস্থান নেবে, তা নিশ্চিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *