মোবাইলের লাস্ট লোকেশনই বাঁচিয়ে রাখবে তো? হিমালয়ের ভয়ংকর বন্যায় নিখোঁজ মেয়েকে খুঁজতে হন্যে হয়ে ঘুরছেন বাবা!

নেপালে গত মাসে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী বন্যার ক্ষত এখনও তাজা। হিমালয় ঘেরা ওই অঞ্চলে সর্বগ্রাসী জলচ্ছ্বাস আর ধসের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন বহু মানুষ। চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহ ভেঙে নেমে আসা বিশাল পাহাড়ের টুকরো ও মণ্ড গোটা একটি এলাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কেবল নেপানলেই এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ে ১,৩৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫,১৩০ জন মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। পাশাপাশি চীনের দিকেও ৪৩ জনের প্রাণহানির খবর মিলেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫১৯ জন। এই চরম অনিশ্চয়তা আর হাহাকারের মাঝে নিখোঁজ স্বজনদের জীবিত খুঁজে পেতে এখন একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে তাদের মোবাইল ফোনের শেষ লোকেশন বা সিগন্যাল।

হায়দরাবাদের তরুণী আরুশির মর্মান্তিক নিখোঁজ রহস্য:
আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিখোঁজদের এই দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে ভারতের হায়দরাবাদের ৩৩ বছর বয়সি কনসালট্যান্ট অরুশী গুপ্তার নাম। পবিত্র কৈলাশ মানসरोवर যাত্রায় অংশ নিতে তিনি নেপালে গিয়েছিলেন। গত ২৩ আগস্ট দিল্লি থেকে কাঠমান্ডু পৌঁছানোর পর, ২৬ আগস্ট তাঁর চীন-নেপাল সীমান্ত পার হওয়ার কথা ছিল। ঠিক বন্যার দিন সকালেও তিনি তাঁর বাবা অজয় গুপ্তাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে জানিয়েছিলেন যে তিনি সীমান্ত থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থান করছেন।

এরপর সীমান্ত পার হওয়ার সময় চীনের দিকের গ্যিরং পোর্ট ইমিগ্রেশন পোস্টের একটি ছবিও বাবাকে পাঠিয়েছিলেন অরুশী। আর সেটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ ছবি। এরপর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ এবং হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের কোনো উত্তর মেলেনি। তবে বাবা অজয় গুপ্তার বুক এখনও বিশ্বাস করে, অলৌকিকভাবে হয়তো তাঁর মেয়ে কোনো উঁচুতে বা নিরাপদ আশ্রয়ে বেঁচে রয়েছে। মেয়ের সেই শেষ মোবাইল লোকেশনটুকুই এখন এই বৃদ্ধ বাবার বাঁচার একমাত্র খড়কুটো।

ইউক্রেনের পর্যটকের খোঁজ মিলছে আইফোনের ‘ফাইন্ড মাই’ অ্যাপে:
অনুরূপ এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে ইউক্রেনের ৪২ বছর বয়সি নারী ওলেনার সঙ্গে, যিনি একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার অংশ হিসেবে চীন-নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁর মেয়ে ভ্লাদিস্লাভা হোরলোভা বর্তমানে নরওয়েতে বসে মায়ের খোঁজে প্রতিনিয়ত গুগল ও বিভিন্ন টেকনিক্যাল মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন। ওলেনার সঙ্গে সফর করা আরও প্রায় ৪৬ জন ইউক্রেনীয় নাগরিকের এখনও কোনো খোঁজ মেলেনি।

ভ্লাদিস্লাভা তাঁর মায়ের আইফোনের ‘ফাইন্ড মাই’ (Find My) অ্যাপের সাহায্যে শেষ লোকেশন ট্র্যাক করার চেষ্টা করেছেন। ওই অ্যাপের ডেটা অনুযায়ী, ওলেনার মোবাইল ফোনটির শেষ লোকেশন চীনের সীমানার দিকে দেখাচ্ছিল, অথচ তাঁর অ্যাপল ওয়াচ (Apple Watch) ও এয়ারপডস (AirPods)-এর সিগন্যাল নেপালের সীমানার মধ্যে পাওয়া গেছে। এই পরস্পরবিরোধী ডিজিটাল লোকেশন থেকেই পরিবারটি বোঝার চেষ্টা করছে যে, বন্যার ঠিক কোন মুহূর্তে তাঁরা কোথায় ছিলেন এবং আদতে তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে।

মোবাইল অপারেটরদের সাহায্যের আকুল আবেদন:
এদিকে ভারতে অরুশীর সঙ্গে ওই একই ট্রিপে যাওয়া অন্য পর্যটকদের পরিবারগুলোও মোবাইল নেটওয়ার্কের শেষ লোকেশন উদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। পুণের বাসিন্দা সচীন যোশী সহ বেশ কয়েকজন পরিবারের সদস্য ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের কাছে আর্জি জানিয়েছেন, যাতে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানির মাধ্যমে টাওয়ার লোকেশন ট্রেস করে দ্রুত নিখোঁজদের সন্ধান মেলানো যায়।

উদ্ধারকারী দলগুলির রিপোর্ট বলছে, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্টের টানেল বা সুড়ঙ্গ থেকে এখনও পর্যন্ত কিছু মানুষকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আর এই খবরগুলোই চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারগুলোকে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। মেয়ের খোঁজে এবার নিজেই নেপাল যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অরুশীর পরিবার। প্রযুক্তির এই আধুনিক পথ ধরেই কি তবে মিলবে কোনো আলোর দিশা? উত্তরের অপেক্ষায় গোটা দেশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *