এবার কি পকেট কাটবে ইউপিআই ব্যবহারে? ২০০০ টাকার লেনদেনে ফি বসা নিয়ে হঠাৎ কেন তোলপাড় দেশ?

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আজ বিশ্বমঞ্চে নিজের আসন পাকা করে নিয়েছে ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস অর্থাৎ ইউপিআই (UPI)। পথচলার সফল ১০ বছর পার করে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০টি দেশে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ভারতের এই ডিজিটাল লেনদেন মাধ্যম। ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (NPCI)-র পরিচালনায় পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০০৭-এর আওতায় চলা এই পরিষেবা আজ দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমার্থক হয়ে উঠেছে। তবে একদিকে যেমন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এই ব্যবস্থা, তেমনই অন্যদিকে ফি বসানোর জল্পনা এবং সাইবার জালিয়াতির ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যান নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ইউপিআই লেনদেনে ফি বসার গুঞ্জন ও রাজনৈতিক তরজা:
বর্তমানে দেশে ইউপিআই পেমেন্টের ক্ষেত্রে নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক বা ফি বসানো নিয়ে প্রবল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেন্দ্রের তরফ থেকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ব্যাঙ্ক এবং পেমেন্ট প্রোভাইডাররা ২,০০০ টাকা পর্যন্ত কোনো ইউপিআই লেনদেন বা রুপে ডেবিট কার্ডের পেমেন্টের ওপর কোনো অতিরিক্ত চার্জ কাটতে পারবে না। তবে ২,০০০ টাকার বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ফি লাগবে কিনা কিংবা সেই চার্জ ব্যবসায়ীদের বহন করতে হবে কিনা, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি।

এই প্রসঙ্গেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, মোদী সরকার পিছনের দরজা দিয়ে ইউপিআই-এর ওপর ফি চাপানোর পথ প্রশস্ত করছে। তাঁর দাবি, ২,০০০ টাকার বেশি পরিমাণের মার্চেন্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে এমডিআর (MDR) বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট লাগু করা হতে পারে। যদিও এই ধরনের বড় লেনদেনের সংখ্যা মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি, তবুও তা ইউপিআই-এর মোট লেনদেন মূল্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ দখল করে রয়েছে।

৫৫ কোটির মাইলফলক ও ৬ গুণ বৃদ্ধি:
চলতি বছরের জুলাই মাসে সংসদের নিম্নকক্ষে পেশ করা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত ইউপিআই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া ইউজারের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৫৫ কোটি ৪৯ লক্ষের গণ্ডি। বিগত বছরগুলির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২১-২২ সালের আর্থিক বছরে যেখানে ২৪,১৬১ কোটি টাকার কাছাকাছি বার্ষিক লেনদেন হয়েছিল, তা বেড়ে ২০২৫-26 অর্থবছরে প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪,১৬১ কোটি বারেরও বেশি লেনদেন। টাকার অঙ্কের হিসেবে যা প্রায় ৩১৪.২৩ লক্ষ কোটি টাকা ছুঁয়েছে।

ভুটান থেকে কম্বोडিয়া—বিশ্বজুড়ে ইউপিআই-এর জয়যাত্রা:
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও ইউপিআই নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ২০২১ সালের জুলাই মাসে প্রথম প্রতিবেশী দেশ ভুটানে এটি চালু করা হয়। এরপর একে একে সিঙ্গাপুর (আগস্ট ২০২১), ইউএই (এপ্রিল ২০২২), ফ্রান্স, মরিশাস ও শ্রীলঙ্কা (ফেব্রুয়ারি ২০২৪), নেপাল (মার्च २०२४), কাতার (সেপ্টেম্বর ২০২৫), গ্রিস (মে ২০২৬) এবং সর্বশেষ চলতি বছরের জুন মাসে কম্বোডিয়ায় প্রবেশ করেছে ইউপিআই। বর্তমানে মোট ১০টি দেশে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজ লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে।

সাইবার জালিয়াতির ক্রমবর্ধমান গ্রাস:
ডিজিটাল পেমেন্টের এই অভাবনীয় সাফল্যের পাশাপাশি মুদ্রার উল্টো পিঠ অর্থাৎ সাইবার প্রতারণার চিত্রটি অত্যন্ত ভীতিজনক। দেশে অনলাইন লেনদেন যত দ্রুত গতিতে বেড়েছে, ততটাই অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে জালিয়াতদের জন্য। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে যেখানে সাইবার জালিয়াতির মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ২.৬ লক্ষ, তা লাফিয়ে বেড়ে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে প্রায় ২৮ লক্ষে গিয়ে ঠেকেছে। এই সমস্ত প্রতারণায় হাত বদল হওয়া মোট অর্থের পরিমাণ ৫১১ কোটি টাকা থেকে এক লাফে বেড়ে দাঁড়াল প্রায় ২২,০০০ কোটি টাকারও বেশি।

ইউপিআই সংক্রান্ত জালিয়াতির ক্ষেত্রেও একই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ৭.২৫ লক্ষ জালিয়াতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল (যার আর্থিক পরিমাণ ছিল ৫৭৩ কোটি টাকা), পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৪২ লক্ষ মামলায় (১,০৮৭ কোটি টাকা)। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই জালিয়াতির পালে কিছুটা ভাটা পড়েছে এবং তা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *