বিজ্ঞান দুনিয়ায় ইতিহাস গড়ার মুখে ভারত! গুজরাতের ল্যাবে বন্ধী হতে চলেছে ‘কৃত্রিম সূর্য’?

পৃথিবীর বুকেই এবার বন্দি হতে চলেছে মহাবিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও রহস্যময় ক্ষমতা— নক্ষত্রের শক্তি! মহাজাগতিক এই শক্তিকে হাতের মুঠোয় আনতে গিয়ে ভারতের বিজ্ঞান ইতিহাস এক ঐতিহাসিক মাইলফলকের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। গুজরাতের ‘ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা রিসার্চ’-এর গবেষণাগারে বহুল প্রতীক্ষিত ‘কৃত্রিম সূর্য’ (Artificial Sun) তৈরির স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে আরও এক ধাপ। সম্প্রতি তাদের ‘এসএসটি-১ টোকামাক’ (SST-1 Tokamak) যন্ত্রে সফলভাবে বসানো হয়েছে ৮২.৬ গিগাহার্ৎজ ও ৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার অত্যন্ত শক্তিশালী এক ‘জাইরোট্রন’।

কী এই নিউক্লিয়ার ফিউশন ও টোকামাক? সাধারণ তাপবিদ্যুৎ বা পরমাণু কেন্দ্রের মতো পুড়িয়ে শক্তি তৈরি এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয়। কোটি কোটি মাইল দূরে সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র যে প্রক্রিয়ায় আলো ও উত্তাপ ছড়ায়, ঠিক সেই ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’ (Nuclear Fusion) প্রক্রিয়াকেই ল্যাবরেটরিতে ফুটিয়ে তুলছেন বিজ্ঞানীরা। এই প্রক্রিয়ায় চরম তাপ ও চাপে হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একত্রিত করে বিপুল শক্তি তৈরি করা হয়।

এই পুরো গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘প্লাজমা’— যা পদার্থের এক অতি-উত্তপ্ত ও বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত অবস্থা। প্লাজমাকে রেকর্ড পরিমাণ উত্তপ্ত করে একটি ডোনাট আকৃতির ‘টোকামাক’ যন্ত্রের ভেতর শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সাহায্যে বন্দি রাখা হচ্ছে।

সূর্যের চেয়ে ২০ গুণ বেশি গরম! ভারতীয় বিজ্ঞানীদের এই ফিউশন পরীক্ষায় প্লাজমার তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে ২০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডিতে! পাঠকদের জানিয়ে রাখা ভালো, এই উত্তাপ সূর্যের কেন্দ্রের আনুমানিক তাপমাত্রার চেয়েও প্রায় ২০ গুণ বেশি।

তবে কেবল চরম তাপমাত্রা তৈরি করলেই ফিউশন সফল হয় না। আসল চ্যালেঞ্জ হলো— সেই অকল্পনীয় উত্তপ্ত প্লাজমাকে দীর্ঘক্ষণ স্থিতিশীল রাখা। সামান্যতম অস্থিরতা তৈরি হলেই পুরো প্রক্রিয়া নষ্ট হতে পারে।

নতুন ‘জাইরোট্রন’-এর জাদুকরী ভূমিকা প্লাজমাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখার এই কঠিন চ্যালেঞ্জ জয় করতেই কাজে লাগানো হচ্ছে নতুন জাইরোট্রন।

  • মাইক্রোওয়েভ শক্তি: এটি একটি উচ্চ-প্রযুক্তির যন্ত্র, যা বিপুল পরিমাণ মাইক্রোওয়েভ শক্তি উৎপন্ন করে প্লাজমার গভীরে পৌঁছে দেয়।

  • আপগ্রেডেড ক্ষমতা: আগের ৪২ গিগাহার্ৎজের জায়গায় নতুন ৮২.৬ গিগাহার্ৎজের এই ব্যবস্থা প্লাজমাকে বহুগুণ বেশি স্থিতিশীল রাখবে।

  • চৌম্বকীয় ব্যারিকেড: মহাকাশে সূর্যের বিপুল মাধ্যাকর্ষণ শক্তি প্লাজমাকে আটকে রাখে। কিন্তু পৃথিবীতে সেই উপায় না থাকায় অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে এমনভাবে প্লাজমাকে ঘেরা হচ্ছে, যাতে তা কোনোভাবেই রিঅ্যাক্টরের দেওয়ালে না স্পর্শ করে।

পরিচ্ছন্ন শক্তির এক নতুন ভোর বিশ্বজুড়ে ফিউশন শক্তিকে বলা হয় ‘ক্লিন এনার্জি’ বা পরিচ্ছন্ন শক্তির ভবিষ্যৎ। এর জ্বালানি যেমন পৃথিবীতে অঢেল, তেমনই এর থেকে বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরির সম্ভাবনাও নগণ্য।

যদিও এই প্রযুক্তি দিয়ে এখনই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হচ্ছে না, তবে চরম উত্তপ্ত প্লাজমাকে দীর্ঘক্ষণ নিয়ন্ত্রণ ও ধরে রাখার এই ক্ষমতা ভারতকে বিশ্ববিজ্ঞানের দরবারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। আগামী দিনে নক্ষত্রের এই শক্তিই হয়তো মেটাবে সমগ্র মানবজাতির শক্তির চাহিদা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *